সংবাদ · স্বাস্থ্য
বেলকা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিজেই ‘অসুস্থ’ চিকিৎসক ও জনবলসংকটে
২১/১০/২০২৬

চিকিৎসকসংকট, তদারকির অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের উদাসীনতায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন নিজেই যেন ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছে। একসময় স্থানীয় মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়ার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল ছিল এটি। তবে বর্তমানে কেন্দ্রটির অবকাঠামো ও সেবার মান নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে।চারপাশে ঝোপঝাড়, ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা এবং ভেতরে পোকামাকড়ের আবাসন–সব মিলিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো পরিবেশ এখানে নেই বললেই চলে। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত ভবনটি দীর্ঘদিনের অবহেলায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অথচ এটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে সেবা নিতে এসে প্রতিদিন বহু মানুষকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৭টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এ ছাড়া ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ১৩৬টি পদ শূন্য। ১৫টি ইউনিয়নের জন্য ১৫ জন মেডিকেল অফিসার বা সহকারী সার্জনের পদ এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ১৫টি ইউনিয়নে ১৭ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে। পাশাপাশি একটি অ্যাম্বুলেন্সচালকের পদও অনুমোদিত। তবে এসব পদে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক ও জনবলসংকটে অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ থাকায় অনেক মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।স্থানীয় বেলকা বাজারের বাসিন্দা মো. সুমন মিয়া বলেন, 'স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থা দেখে মনে হয় এটি দেখাশোনার কেউ নেই। সপ্তাহে এক-দুই দিন খোলে, তা-ও মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। একজন পুরুষ ও একজন নারী কর্মী এখানে ওষুধ বিতরণ করেন। কেন্দ্রের বারান্দায় খড়ের স্তূপ, সামনে কাঁকড়া গাড়ি, মাইক্রোবাস, ট্রলি, ভটভটি ও ডেকোরেটরের বাঁশ ফেলে রাখা হয়েছে। চারপাশে ঝোপঝাড় আর ভেতরে পোকামাকড়ের বাসা। এমন পরিবেশে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব।'বেলকা চর এলাকার বাসিন্দা আসমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'তিন দিন ধরে ওষুধের জন্য ঘুরছি। আজ এসেও দেখি ডাক্তার নেই। আগে সব সময় ওষুধ পাওয়া যেত। এখন হাসপাতালে ঢুকলে মনে হয় অনেক দিন ধরে এখানে কেউ আসে না।'নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, 'বেলকা রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বড় বড় নেতা থাকলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির এ দুরাবস্থা নিয়ে কেউ কথা বলেন না। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।'অভিযোগের বিষয়ে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট মো. ফখরুচ্ছায়াম বলেন, 'আমাকে একাধিক জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। এখানে সপ্তাহে দুই দিন ওষুধ বিতরণ করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। স্থানীয়দের আন্তরিকতার অভাবেই আশপাশের পরিবেশ এমন রূপ নিয়েছে।'সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. মো. কামরুল হাসান বলেন, 'নিয়মিত অফিস খোলা না থাকলে বা তদারকি না হলে একা আমার পক্ষে সব সামলানো সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির এই অবস্থার পেছনে স্থানীয়দের অসচেতনতাও দায়ী। তবে চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি সত্য। আশপাশের পরিবেশ ভালো রাখতে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার বিকল্প নেই।'স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জোরদার করা গেলে বেলকা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আবারও সচল করা সম্ভব। কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে–এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗