রাজধানীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মীদের একত্র করতে চেয়েছিলাম অনেকদিন ধরে। তাদের কথা ও অভিজ্ঞতা শুনে তাদের মাঝে কিছু সচেতনতা পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমার উদ্দেশ্য।
কিন্তু কিছুতেই সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ প্রতিদিনের জীবনে তারা সবাই অনেক ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া একেকজনের কাজের সময় একেক রকম।
অবশেষে ১৮ অক্টোবর আমরা একত্র হবে বলে সবাইকে রাজি করালাম। ঠিক হল সকাল ৯টায় ঢাকার ইন্দিরা রোডের একটি কমিউনিটি হলে একত্র হব সবাই। এজন্য আগের দিনই সব প্রস্তুতি শেষ করে রেখেছিলাম।
সকাল ৯টা থেকে অপেক্ষা করছি। কিন্তু কেউ আসছে না। আমার সহযোগীরাও ভাবতে শুরু করল হয়ত কেউই আসবে না। কয়েকজনকে ফোন করলাম কিন্তু সাড়া পেলাম না। তবু হাল ছাড়িনি।
সময় গড়াতে লাগল। সকাল ১১টার দিকে একজন-দুজন করে আসতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল আমার আশা। শেষ পর্যন্ত জেসমিন, মর্জিনা, জোসনা, রিনা ও ফাতেমার মত জীবনসংগ্রামে যুক্ত ৩১ জন নারী উপস্থিত হন।
কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তাদের গল্প শুনতে শুরু করি। কেমন ছিল শৈশব, কী খেলে কাটত সময়, স্কুলে গিয়েছে কিনা, কত দূর পড়াশোনা করেছে, কেমন ছিল ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক, সংসারে সচ্ছলতা ছিল কিনা, এসব বিষয়ে কথা বলতে লাগল তারা।
উঠে এল বর্তমান জীবনের গল্পও। সংসার, স্বামী, সন্তান আর বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে পাওয়া তিক্ত ও মধুর অভিজ্ঞতার কথা।
অবাক হয়ে লক্ষ করি, অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত নারীরা মুহূর্তেই যেন একে অপরের আপন হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, শৈশবের স্মৃতি আর বর্তমান জীবনের নানা অভিজ্ঞতা এক দিনেই বলে শেষ করতে চান তারা। হয়ত আবার কবে এমন করে একসঙ্গে বসার সুযোগ পাবেন তা জানেন না।
তাদের কাছে এক দিন গল্প করে কাটানোর সুযোগটাও যেন বিলাসিতা। অনেক সময় কাজ বাদ দিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না তাদের। কাজ না থাকলেও অবসর কাটানোর সুযোগ যে সব সময় মেলে, তা-ও নয়।
মূলত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। একটি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, অন্যটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের করণীয়।
কথা বলতে গিয়ে জানতে পারি, উপস্থিত ৩১ জন নারীর প্রত্যেকেরই বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর বয়সের আগে। তাদের কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়নি বলে তারা জানান, কেউ এর প্রতিবাদও করেননি। কারণ তাদের কাছে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
কারও বিয়ে হয়েছিল দারিদ্র্যের কারণে, কেউ ভালো থাকার আশায় বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। কেউ পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে বিয়ে করেছিলেন আবার কেউ ভালোবেসে বাড়ি ছেড়েছিলেন ১৮ বছর হওয়ার আগেই।
কিন্তু বিয়ের পরের জীবন কারও জন্যই সুখের ছিল না। কারও নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সন্তান নিতে হয়েছে, কেউ জীবনের অনেক কিছু বোঝার আগেই মা হয়েছেন। অসুস্থ হয়েও কেউ চিকিৎসা পাননি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এলেও জোটেনি প্রয়োজনীয় যত্ন। আর গৃহকর্মীর কাজ করতে হবে এমন জীবন তারা কেউই চাননি।
তাদের যাদের মেয়ে আছে তারা চান না মেয়েদেরও একই পরিণতি হোক। তারা চান না, তাদের মেয়েরা অল্প বয়সে সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্বে আটকে পড়ুক কিংবা বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করুক। কিন্তু কীভাবে এই পরিণতি ঠেকাবেন তা নিয়ে তাদের অনেকেরই ছিল অনিশ্চয়তা।
আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের উপায় আছে। পরিবারকে বোঝানো, বিশ্বস্ত কারও সাহায্য নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় প্রশাসন বা শিশু সুরক্ষায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চাওয়ার মত বিভিন্ন পথ রয়েছে।
রাহেলা, জরিনা, সুমি ও তৈয়বার মতো কয়েকজন নারী অঙ্গীকার করলেন পরিবারের অন্যরা রাজি না হলেও তারা মেয়েদের বাল্যবিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করবেন। তারা চান, তাদের মেয়েরা যেন নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় এবং পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
সেদিন তারা সবাই মিলে বাল্যবিয়েকে লাল কার্ড দেখান। ১৮ বছর বয়সের আগে নিজেদের মেয়ে কিংবা পরিচিত কারও সন্তানের বিয়ে না দেওয়ার অঙ্গীকার করলেন।
এরপর কথা হল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। বিষয়টি শুনে তাদের অনেকেই অবাক হলেন। পরিবেশের ক্ষতি মোকাবিলায় তাদেরও যে ভূমিকা রয়েছে, তা আগে এভাবে ভাবেননি তারা।
আমি তাদের বোঝালাম, শীতের রাতে পুরোনো টায়ার না পোড়ানো, অকারণে গাছ না কাটা এবং প্রয়োজন শেষে বাতি, পাখা ও গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখার মত অভ্যাস পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। বায়ুদূষণ ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও তাদের সঙ্গে কথা বললাম।
তারা বুঝতে পারেন যে, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নয়। ব্যক্তিগত অভ্যাস ও দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমেও প্রত্যেকে ভূমিকা রাখতে পারেন।
আলোচনা শেষে নারীরা জানালেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও তারা সচেতন থাকবেন।
অনুষ্ঠানের শেষে তাদের সমস্বরে, দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা আমার জন্য ছিল অনুপ্রেরণার। তাদের কথায় নতুন করে স্বপ্ন দেখলাম, এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে কোনো মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হতে হবে না আর পরিবেশদূষণের কারণে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে না।
আমি বিশ্বাস করি, পরিবর্তনের শুরু হতে পারে এমন ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই। প্রয়োজন শুধু মানুষের কথা শোনা, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।
