নতুন ও আরও দক্ষ ডিজাইনের মেমোরি চিপ তৈরির গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীনের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা কোম্পানি সিএক্সএমটি।
এরপরই মঙ্গলবার বিশ্ব পুঁজিবাজারে বিভিন্ন চিপ নির্মাতা ও প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারদামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এক ঘোষণায় চীনের মেমোরি চিপ তৈরির অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি ‘চাংশিন মেমোরি টেকনোলজিস’ বা সিএক্সএমটি বলেছে, তারা চিপের নতুন এক আর্কিটেকচার বা নকশা গঠনে সাফল্য পেয়েছে।
এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে বেশি পরিমাণ ডেটা বা তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সিএক্সএমটি-এর এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে ঝড় তুলেছে।
বিশ্বের মেমোরি চিপ পরাশক্তি মাইক্রন, এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের মতো বৈশ্বিক কোম্পানির বিপরীতে চীন থেকে উঠে আসা শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয় সিএক্সএমটি’কে।
তবে সাম্প্রতিক এক ব্লকবাস্টার আইপিও’র আগে চীনের নিজস্ব বাজারের বাইরে এ কোম্পানিটি সম্পর্কে খুব বেশি মানুষের ধারণা ছিল না।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাক-লেনদেনে মার্কিন চিপ নির্মাতা ‘মাইক্রন’-এর শেয়ারদর ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেন বন্ধ হওয়ার সময় ‘এসকে হাইনিক্স’-এর শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় ১০ শতাংশ ও ‘স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স’-এর দাম ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এ ছাড়া, স্যানডিস্ক, সিগেট ও ওয়েস্টার্ন ডিজিটালের মতো মেমোরি খাতসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের দামেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
আলোড়ন তৈরিকারী আইপিও
এ বছরের জুলাইয়ে আইপিও’তে যোগ হয়ে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে আসে সিএক্সএমটি।
সাংহাইয়ের প্রযুক্তিভিত্তিক ‘স্টার মার্কেট’-এ আত্মপ্রকাশের প্রথম দিনেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম লাফিয়ে প্রায় ৪৬৬ শতাংশ বাড়ে। ফলে রাতারাতি চীনের অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে দামি কোম্পানিতে পরিণত হয় এটি।
অভিষেকের দিন শেয়ারপ্রতি ৪৯ ইউয়ান থেকে শুরুর পর বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৪ শতাংশ কমলেও এর সার্বিক বাজারদর এখন ৩.৪৬ ট্রিলিয়ন চীনা ইউয়ান বা ৫২ হাজার কোটি ডলার।
এ বাজারদর চীনের অন্যতম বড় প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘টেনসেন্ট’-এর ৩.৮৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের অনেকটাই কাছাকাছি।
চীনের হেফেই শহরে প্রধান কার্যালয় অবস্থিত সিএক্সএমটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে ২০১৬ সালে। প্রতিষ্ঠার ঠিক এক দশকের মাথায় এসে বাজারে বড় সক্ষমতার জানান দিল কোম্পানিটি।
আইপিও প্রকাশের পর সিএক্সএমটি’কে ঘিরে বিশ্লেষকদের প্রধান প্রশ্ন ছিল, কোম্পানিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চিপ সিস্টেমের অন্যতম প্রধান উপাদান ‘হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ নির্মাণের ক্ষেত্রে মাইক্রন, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতার ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারবে কি না।
চীনের অভ্যন্তরীণ বড় আকারের চাহিদা সিএক্সএমটি’কে বাণিজ্যিকভাবে টিকিয়ে রাখলেও উন্নত চিপ তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের বাধার মুখে রয়েছে কোম্পানিটি।
সবচেয়ে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য ডাচ কোম্পানি ‘এএসএমএল-এর অতি-বেগুনি রশ্মিভিত্তিক ‘ইইউভি’ লিথোগ্রাফি মেশিনের মতো প্রযুক্তি পাওয়ার পথ মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সিএক্সএমটি তাদের নতুন সেল আর্কিটেকচারের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের শেষদিকে সার্ভার মেমোরির জন্য নতুন পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে।
নতুন ডিজাইনটি ‘ফোর-এফ স্কয়ার’ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে উচ্চতর স্টোরেজ সক্ষমতা দেয়। ‘ফোর-এফ স্কয়ার’ নকশা নিয়ে কাজ করছে এসকে হাইনিক্সও, যারা ২০২৫ সালে এই প্রযুক্তি বিকাশের রোডম্যাপ প্রকাশ করেছিল।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপ খাতের শীর্ষ উদ্ভাবকদের তুলনায় সিএক্সএমটি কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যে কোনো খবর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য কোম্পানি একক আধিপত্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
বাজার দখলে বড় সাফল্য
মার্কিন সরকারের কড়া রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার নানামুখী চ্যালেঞ্জ থাকার পরও আন্তর্জাতিক চিপের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি অস্বাভাবিক গতিতে বাড়িয়ে চলেছে সিএক্সএমটি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বৈশ্বিক ব্যাংক এইচএসবিসি’র এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের অন্যতম প্রধান উপাদান ‘ডায়নামিক র্যান্ডম-অ্যাক্সেস মেমোরি’ বা ডিআরএএম-এর বৈশ্বিক বাজারে কোম্পানিটির অংশীদারিত্ব প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে। এক বছর আগেও এই বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব ছিল কেবল চার শতাংশ।
গেল অগাস্টে এক পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবা কোম্পানি সিটি গ্রুপের বিশ্লেষকরা বলেছেন, “মার্কিন সরকার হয়ত তাদের দেশে তৈরি প্রযুক্তিতে চীনের চিপ ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
“তবে ইউরোপের মতো অন্যান্য অঞ্চলের ডেটা সেন্টারগুলোতে এসব চীনা চিপ সরবরাহ শুরু হলে তা পরোক্ষভাবে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানি মাইক্রনের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।”
এদিকে, জুলাইয়ে এ সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে যুক্ত সূত্র উদ্ধৃত করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছিল, চীনা বাজারে বিক্রিত নিজেদের বিভিন্ন ডিভাইসে সিএক্সএমটি’র তৈরি ডিআরএএম চিপ ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল।
বিশ্বজুড়ে নিজেদের অন্যান্য পণ্যেও যেন এই চিপ ব্যবহার করা যায় সেজন্য তারা মার্কিন সরকারের সঙ্গে লবিয়িং চালিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এফটি।
