ক্যাথরিন ভন এই শরতে পশ্চিম টেনেসির একটি গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন তার কাজ শুরু করেন, তখন তার মানসিক চাপ আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
৪৬ বছর বয়সী এই নারী, অনেক আমেরিকানদের মতোই, সবকিছুর ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবার কীভাবে চালাবেন তা নিয়ে সংগ্রাম করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, তিনি চারজনের পরিবারকে সামলাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিল্প শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিদিন তিনটি ভিন্ন ভিন্ন চাকরি করেন।
সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মাসে পণ্যমূল্য ৩.৭ শতাংশ বেড়েছে—যা আগস্ট পর্যন্ত ১২ মাসে ছিল ৩.৪ শতাংশ। ডিজেলের মূল্য রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং পেট্রোলের দামও বেড়েছে। এভাবেই জ্বালানির উচ্চ মূল্য যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এই পুরো বোঝাটি এসে পড়েছে সাধারণ মার্কিনিদের কাঁধে।
স্কুলের কাজ শেষ হওয়ার পর, ক্যাথরিন ভন ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের জন্য আয়োজিত বিকেলকালীন প্রোগ্রামের ফেসিলিটেটর হিসেবে তার দ্বিতীয় চাকরিতে যান। সেখানে তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেও যোগ দিতে পারে, যা ভনের পরিবারের জন্য বিকেলের শিশু পরিচর্যার খরচ ও ঝামেলা কমায়।
ক্যাথরিণ ভন বলেন, ‘টিকে থাকার জন্য আমি অবিশ্বাস্য ও পাগলাটে সব কাজ করেছি। আমি স্থানীয় একটি গহনার দোকানের জন্য হ্যান্ড-মডেলিং করেছি, আমার ঘরে ১০ মিনিটের বেশি সময় যা অব্যবহৃত পড়ে থাকে তা ফেসবুক সোয়াপ সাইটে বিক্রি করে দিই, থ্রেডআপ এবং পশমার্ক -এ পুরোনো পোশাক বিক্রি করি।’
বাড়তি কিছু উপার্জনের জন্য ভন এমনকি মৃত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণামূলক জীবনী লেখার কাজও করেন। তবে পরিবারের চাহিদা মেটাতে এতকিছুও যথেষ্ট হচ্ছে না।
অন্যদিকে, পুনাল ভবসার ভেবেছিলেন ২০২৬ সালটি এমন এক বছর হবে যখন তিনি বাড়ি কেনার জন্য পর্যাপ্ত টাকা জমাতে পারবেন।
৩৯ বছর বয়সী ভবসার বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সুদের হার কমবে এবং আমি একটি বাড়ি কিনতে পারব, কিন্তু এখন আর তা সম্ভব মনে হচ্ছে না।’ তিনি জানান, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে টাকা জমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ভবসারের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে পেট্রোলের দাম।
পুনাল ভবসার বলেন, ‘আমি যে গাড়িটি চালাই তাতে প্রিমিয়াম গ্যাসের প্রয়োজন হয়, আর দুর্ভাগ্যবশত ক্যালিফোর্নিয়া এবং আমি যেখানে থাকি সেখানে এর দাম প্রায় ৬ ডলারের মতো।’
নভেম্বর মাসে যখন মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিশ্চিতভাবেই ভোটারদের ভাবনায় থাকবে, তখন ভবসার জানান, তিনি হয়তো একটি মাত্র ইস্যুতেই ভোট দেবেন আর তা হলো- যে কোনো উপায়ে পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
পুনাল ভবসার বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে বর্ণনা করেছেন এবং পরিসংখ্যানও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করে। গ্যালাপ ইকোনমিক কনফিডেন্স ইনডেক্স আমেরিকানদের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের মূল্যায়নের ভিত্তিতে -১০০ থেকে +১০০ স্কেলে প্রকাশ করে। সেপ্টেম্বরে আমেরিকানরা সেই সূচককে -৪০ এ নামিয়ে এনেছে। 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর এক গ্রীষ্মকালীন জরিপে দেখা গেছে যে অবিশ্বাস্য ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন আমেরিকা একটি জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে ভুগছে।
এই শরতে আমেরিকা জুড়ে মানুষ এই সংকটের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজছে।
ক্যাটলিন গ্রিন সাত বছর আগে যখন প্রথম ইউটাহতে চলে আসেন, তখন তার মা তাকে নতুন বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘যদি কখনো কোনো সস্তা ও সহজ খাবারের দরকার হয়, তবে সবসময় গরুর মাংসের কিমা কিনবে।’
কিন্তু দাম বাড়ার সাথে সাথে ক্যাটলিন গ্রিন সেই পরামর্শ মেনে চলতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি স্মরণ করেন আগে এক পাউন্ড গরুর মাংসের কিমা ২ ডলারে পেতেন, কিন্তু এখন তাকে ৮ ডলার দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে গ্রিন ও তার স্বামী এর বিকল্প হিসেবে কিমা করা টার্কি বা মুরগির মাংস বেছে নিচ্ছেন।
ক্যাটলিন গ্রিন বলেন, ‘গরুর কিমা এখন প্রায় একটি বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে... স্টেক-এর মতো একদম বিলাসিতা না হলেও, এটি কেনার আগে আমাদের এখন ভাবতে হয়।’ গ্রিন ও তার স্বামীর মাসিক গৃহস্থালী পণ্যের খরচ ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে।
ক্যাটলিন গ্রিন আরও বলেন, ‘আমি বুঝি মূল্যস্ফীতি একটি বাস্তব বিষয়, কিন্তু আমার জীবদ্দশায় মূল্যস্ফীতি এত দ্রুত এবং এত মারাত্মকভাবে বাড়তে কখনো দেখিনি।’
টেনেসির স্কুল শিক্ষিকা ভনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের ধারা থামছে না। যখন তার সন্তানরা স্কুলে ফিরে যায়, তখন পাঁচ বছর বয়সী ছেলের স্কুলের উপাদানের জন্য ১৩০ ডলারের বিল দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান।
মুদি পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, ভন সিদ্ধান্ত নেন যে, ঘরে খাবার তৈরির চেয়ে স্কুলে দুপুরের খাবার কেনাটা তুলনামূলক সস্তা হবে, তাই প্রতিদিন তার ছেলে স্কুল থেকেই দুপুরের খাবার কিনবে। পেট্রোলের দাম অতিরিক্ত হওয়ায় এই শরতে ফ্লোরিডায় ভনের বাবা-মাকে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনাও স্থগিত করেছে এই পরিবারটি।
ভন বলেন, ‘পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন। সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক। কাজে যাওয়ার জন্য গ্যাস, বিমার খরচ বেড়েছে, দুই সন্তান ও স্বামীকে খাওয়াতে হচ্ছে। বিষয়গুলো সত্যি অনেক কষ্টের।’
