ঘরের মাঠে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য আছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা পাকিস্তানের বিপক্ষেও সেই সামর্থ্যের প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু দেশের বাইরে গেলেই যেন বদলে যায় চেনা বাংলাদেশ। অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও ওয়ানডে সিরিজে হারের পর এবার ত্রিদেশীয় সিরিজের শুরুতে ৯৯ রানের পরাজয়। বিদেশের মাটিতে এই ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে ব্যাটারদের স্কিলের চেয়ে মানসিকতা, প্রস্তুতি ও দলীয় সমন্বয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তানজিদ হাসান তামিম।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আগামীকালের (বুধবার) ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। ফাইনালের আশা টিকিয়ে রাখতে শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানে জিততে হবে বাংলাদেশকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন এই ওপেনার। তার মতে, দেশের মাটিতে যে মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশ খেলে, বিদেশেও সেটি ধরে রাখতে পারলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
তানজিদ তামিম বলছিলেন, ‘স্কিলের সমস্যা থাকলে আমরা ঘরের মাঠেও ভুগতাম। ঘরের মাঠে যেভাবে খেলি, একই মানসিকতা নিয়ে দেশের বাইরেও যদি খেলতে পারি, একই রকম প্রস্তুতি নিয়ে দল হিসেবে ভালো করতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় খুব ভালো হবে।’
বিদেশের মাটিতে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দল। ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে এমন ব্যর্থতার পেছনে জুটির অভাবকেই বড় কারণ মনে করছেন তানজিদ। তার মতে, একের পর এক উইকেট হারানোই ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর উপায়ও বাতলে দিয়েছেন তিনি। ৩০০ কিংবা ৩৫০ রানের বড় লক্ষ্যকে একসঙ্গে মাথায় না রেখে ছোট ছোট লক্ষ্য ধরে এগোনোর পরামর্শ তার। তানজিদ বলেন, ‘আমরা যদি ৩০০-৩৫০ চিন্তা না করে ছোট ছোট লক্ষ্য ধরে খেলি, তাহলে আমার মনে হয় কাজটা সহজ হবে। আমাদের এভাবেই মানসিকতা তৈরি করতে হবে।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের পর বাংলাদেশ দলের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। আবুধাবিতে দলের ৯৯ রানের পরাজয়ের পর মাঠেই ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠক করেন তিনি। সেই বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল, এবার তা জানিয়েছেন জাতীয় দলের ওপেনার।
তানজিদের মতে, কঠিন সময়ে ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি। দলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তানজিদ বলেন, ‘খুব ভালো একটা সভা হয়েছে ওনার সাথে আমাদের। কারণ দেখেন যে বিসিবি আমাদের ভালো সময়, খারাপ সময়, সবসময় আমাদের পাশে থাকে। তো আমাদের কেন সমস্যা হচ্ছে, কী সমস্যা মোকাবিলা করছি আমরা বা এরকম জিম্বাবুয়েতে আমরা ওদের সাথে একদিনের সিরিজটা হেরেছি, তো সবকিছু মিলিয়ে তিনি আমাদের আরও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন।’
বৈঠকে দলের সবাইকে একসঙ্গে থাকার বার্তাও দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি। প্রতিপক্ষের নাম কিংবা শক্তি বিবেচনা না করে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচকে সমান গুরুত্ব দিয়ে খেলার পরামর্শ ছিল তার। তানজিদতিামিম জানালেন, ‘তিনি আমাদের সেই ইতিবাচক বার্তাটাই দিয়েছেন যাতে আমরা সবাই একসাথে থাকি এবং একসাথে হয়ে একটি দল হিসেবে আমরা যাতে ভালোভাবে মাঠে নৈপুণ্য দেখাতে পারি প্রত্যেকটা ম্যাচে।’
বিসিবি সভাপতির সেই বার্তার সঙ্গে নিজের ভাবনারও মিল খুঁজে পাচ্ছেন তানজিদ। তার মতে, জিম্বাবুয়ে কিংবা অস্ট্রেলিয়া-প্রতিপক্ষ যেই হোক, প্রস্তুতি ও মনোযোগে কোনো পার্থক্য রাখা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে কিংবা অস্ট্রেলিয়া, এটা না দেখে প্রত্যেকটা আন্তর্জাতিক ম্যাচে একইভাবে মনোযোেগ রেখে, একই প্রস্তুতি রেখে এবং একটি দল হয়ে সব বিভাগে ভালো নৈপুণ্য দেখাতে পারি, এই ইতিবাচক বার্তাটাই তিনি আমাদের দিয়েছেন।’
দলের ঐক্য নিয়েও আশাবাদী এই ওপেনার। সতীর্থদের মধ্যে নেতিবাচকতা ছড়িয়ে পড়ুক, সেটি চান না তিনি। তানজিদের বক্তব্য, ‘আমরা একটা পরিবারের মতো। কেউ চায় না এই পরিবারের মধ্যে নেতিবাচক কিছু তৈরি হোক। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থেকে দল হিসেবে ভালো করতে হবে। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে না অস্ট্রেলিয়া, সেটা না ভেবে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে সমান মনোযোগ ও প্রস্তুতি নিয়ে খেলতে হবে।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তানজিদ আরও একটি বিষয় সামনে এনেছেন। তার মতে, রান তাড়া করার মতো উইকেট পেয়েও বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় জুটি গড়তে পারেনি। শুরুতে উইকেট হারানোর ধারাবাহিকতা দলকে চাপে ফেলে দেয়। সেই চাপের মুহূর্তে কীভাবে শান্ত থেকে বেশি সময় ব্যাটিং করা যায়, সেটিই এখন দলের কাজের জায়গা।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশের ভাবনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তানজিদ। শুধু ব্যাটিংয়ের দক্ষতা নয়, পরিস্থিতি বুঝে খেলা, ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ, চাপ সামলানো এবং দল হিসেবে একসঙ্গে পারফর্ম করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। তবে এসব কথার বাস্তব প্রতিফলন মাঠে কতটা দেখা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ফাইনালের আশা বাঁচিয়ে রাখতে আগামীকালের ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে ভুলের সুযোগ খুবই কম।
