বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামে বিষপানে কাজী মারজান (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বিষপান করেছিল সে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি মাদকের বিস্তার নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মাদক বিক্রির অভিযোগে একটি বাড়িতে উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মারজান রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে সাতটার দিকে বিষপানের পর তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, বিষপানের কারণে ওই কিশোরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মারজানের বাবা কাজী এনামুল হক রিপন অনেক আগেই মারা গেছেন। ছোট এক বোনকে নিয়ে মায়ের সংসারে বেড়ে উঠছিল সে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মারজান দুই থেকে তিন বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিল। মাদক কেনার জন্য সে বিভিন্ন সময়ে পরিবারের কাছে টাকা চাইত। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার চাহিদামতো টাকা দিতে পারত না পরিবার। টাকা না পেলে সে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ত বলে জানান স্বজনেরা।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল খান বলেন, মারজানের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল। মাদক কেনার জন্য সে যে পরিমাণ টাকা চাইত, তা পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হতো না। টাকা না পেলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করত বলে দাবি করেন তিনি।
মারজানের মৃত্যুর পর রহিমাবাদ গ্রামে মাদক কেনাবেচা ও এর সহজলভ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশপাশসহ গ্রামের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা চলছে। এতে এলাকার তরুণদের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ হাসানুল বান্না জানান, রহিমাবাদ একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুস্থ পরিবেশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিস্তার নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অনুরোধ করা হলেও কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শেখ হাসানুল বান্নার অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এলাকায় মাদক কারবার চলছে। বিদ্যালয়ের পাশে একটি ঘর তুলে সেখানে মাদক বিক্রি করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ভাইপোকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু মাদকের কারণে আর কোনো পরিবারের সন্তান যেন এভাবে প্রাণ না হারায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল খানের অভিযোগ, গ্রামের গাবতলা থেকে ভাঙ্গড় এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় মাদক কেনাবেচা চলছে। রহিমাবাদকে মাদকমুক্ত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চান তিনি।
আরেক বাসিন্দা মিলন বলেন, মারজানের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করে গ্রামের তরুণদের সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা বেগ মোকাররম হোসেন বলেন, রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে মাদক কেনাবেচার বিষয়ে তাঁরা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ করেছেন। পরে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মারজানের মৃত্যুর পর স্থানীয় বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের দাবি, মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠা একটি বাড়িতে গিয়ে তারা ঘর সরানোর উদ্যোগ নেন। তাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে বাড়িটির এক ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান বলেও জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে মাদক বিক্রির অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও করা সম্ভব হয়নি।
বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে।’
