কালবেলা · অর্থনীতি
জনগণের করের টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ হয়
২১/১০/২০২৬

বাংলাদেশের নাগরিকরা সরকারকে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করেন কারণ এটি কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত সকল নাগরিক সুবিধা সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিটি নাগরিকের প্রাত্যহিক যাতায়াতে ব্যবহৃত মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু, চার-ছয় লেনের মহাসড়ক ও সেতুসমূহের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মূল খরচ নিশ্চিত হয় সংগৃহীত রাজস্ব থেকে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি প্রদান, সরকারি স্কুল-কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিপুল রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বহনের টাকা আসে সরাসরি এই কর থেকে।
সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কম খরচে চিকিৎসা সেবা, বিনামূল্যের টিকা ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এই রাজস্বের টাকা সরাসরি কাজ করে। দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখতে কৃষকদের সার, সেচের ডিজেল, বীজ ও উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতিতে বার্ষিক যে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার মূল উৎস জনগণের প্রদত্ত কর। দেশের ভেতরে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সশস্ত্র বাহিনীর পরিচালন ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রকে এই তহবিলের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাংক লোন পাওয়া, ক্রেডিট কার্ড ইস্যু, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, জমি বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন এবং সঞ্চয়পত্র কেনাসহ ৫০টিরও বেশি নাগরিকে ই-রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা পিএসআর বাধ্যতামূলক হওয়ায় নিয়ম মেনে কর প্রদান করতে হয়। এছাড়া সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস বা শেয়ারবাজারে টাকা বিনিয়োগ করলে আইনিভাবে প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ট্যাক্স রেয়াত বা ছাড় পাওয়া যায়, যা নাগরিকদের নিজস্ব সম্পদ বাড়াতে সাহায্য করে।
সঠিক নিয়মে আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধ করলে অর্জিত সম্পত্তি সম্পূর্ণ আইনি ও বৈধ হিসেবে নিবন্ধিত থাকে, যার ফলে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অডিট নোটিশ বা কোনো ধরনের জরিমানার ঝুঁকি থাকে না। প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়লে সরকার সাধারণ নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাটের চাপ কম রাখতে পারে, যা বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক সংস্থার কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর দেশের নির্ভরতা বহুগুণ কমে যায়।
জনগণের এই কষ্টার্জিত করের টাকা যেন অপচয় না হয়ে সঠিক খাতে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার বাজেট অনুমোদনের পাশাপাশি প্রতি বছর সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত সহজ ভাষায় নাগরিক বাজেট বা সিটিজেনস বাজেট প্রকাশ করতে পারে, যেখানে গ্রাফিকসের মাধ্যমে দেখানো হবে প্রতি ১০০ টাকা ট্যাক্স থেকে কত টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা যোগাযোগে ব্যয় করা হচ্ছে।
নিবন্ধিত প্রতিটি করদাতার জন্য ই-রিটার্ন পোর্টালে একটি ডিজিটাল পার্সোনাল ড্যাশবোর্ড রাখা যায়, যেখানে নাগরিকরা দেখতে পাবেন তাঁদের প্রদত্ত কর কোন কোন মেগা প্রকল্প বা জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ হিসেবে সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রের সমস্ত সরকারি কেনাকাটা ও কনস্ট্রাকশনের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল সেন্ট্রাল সিস্টেমে পরিচালনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি রোধ করে সর্বনিম্ন খরচে মানসম্মত সরকারি কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া স্থানীয় সরকার বা সিটি কর্পোরেশন পর্যায়ে ট্যাক্সের টাকা কোথায় খরচ হবে সে বিষয়ে স্থানীয় জনগণের সরাসরি মতামত নিতে উন্মুক্ত গণশুনানি ও টাউন হল মিটিংয়ের আয়োজন করা যেতে পারে।
মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বার্ষিক স্বাধীন অডিট রিপোর্ট সংসদের পাশাপাশি সরকারি ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন কাজ সাধারণ জনগণকে দিয়ে যাচাই করার ব্যবস্থা চালু রাখলে সরকারি খরচের স্বচ্ছতা বহুগুণ বেড়ে যায়। যদি কোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বা আর্থিক তছরুপ প্রমাণিত হয়, তবে স্বাধীন অডিট কমিশন গঠনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সরকার যখন প্রযুক্তির ব্যবহারে করের ব্যয়ের শতভাগ হিসাব জনসমক্ষে স্বচ্ছ রাখে এবং দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে তা সঠিক খাতে ব্যয় করে, তখন দেশের নাগরিকদের মাঝে কর প্রদানের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ তৈরি হয় এবং রাষ্ট্র একটি আত্মনির্ভরশীল ও উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়।
বাংলাদেশে নাগরিকরা কেন সরকারকে আয়কর এবং ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) দেবেন-তার সুনির্দিষ্ট কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
মেগা অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
1. মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা: মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল ও বড় বড় মেগা প্রকল্প নির্মাণ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ আসে জনগণের রাজস্ব থেকে।
2. জাতীয় মহাসড়ক তৈরি ও সম্প্রসারণ: চার ও ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার এবং আন্তঃজেলা সংযোগ সড়ক তৈরিতে করের অর্থ ব্যবহৃত হয়।
3. গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন: প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাঁচা রাস্তা পাকা করা, নতুন ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা হয়।
4. রেলপথ ও আধুনিক ট্রেন সেবা: নতুন নতুন রেললাইন স্থাপন, আধুনিক বগি আমদানি ও স্টেশন ডিজিটালাইজেশনে সংগৃহীত ট্যাক্স কাজ করে।
5. সমুদ্র ও আন্তর্জাতিক বন্দর উন্নয়ন: দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে এই অর্থের অবদান অপরিসীম।
মানসম্মত শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিকাশ
1. বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ: বছরের প্রথম দিনেই দেশের কোটি কোটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নতুন বই তুলে দেওয়া নিশ্চিত হয়।
2. শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান: প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দিতে রাজস্বের তহবিল ব্যবহার করা হয়।
3. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল ভর্তুকি: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নামমাত্র খরচে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বজায় রাখা সম্ভব হয় করের টাকায়।
4. শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা: সরকারি ও এমপিওভুক্ত হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করে রাষ্ট্র।
5. প্রযুক্তি ও গবেষণায় অনুদান: উদীয়মান বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, আইটি ও কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া যায়।
জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা
1. সরকারি হাসপাতাল পরিচালনা: ঢাকা মেডিকেল, বিএসএমএমইউ সহ দেশব্যাপী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটায় করের রাজস্ব।
2. বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা প্রদান: প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সার্জারি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিনামূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা হয়।
3. জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি: শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে মুক্ত রাখতে দেশব্যাপী বিনামূল্যে টিকাদান কার্যক্রম সচল রাখা হয়।
4. কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা: গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা সরাসরি করের অর্থে পরিচালিত হয়।
5. মহামারি ও জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা: নতুন কোনো রোগ, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি সামলাতে রাষ্ট্রীয় তহবিল তৈরি রাখা সম্ভব হয়।
কৃষি খাত ও খাদ্য নিরাপত্তা
1. সার ও ডিজেলে বিশাল ভর্তুকি: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে কৃষকদের জন্য রাসায়নিক সার, সেচের ডিজেল ও বীজে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার ভর্তুকির প্রধান উৎস সংগৃহীত কর।
2. কৃষি যান্ত্রিকীকরণ: কৃষকদের স্বল্পমূল্যে আধুনিক ট্রাক্টর, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার সুবিধা দেওয়া হয়।
3. টিসিবি পরিবার কার্ড সেবা: প্রাত্যহিক বাজারদর সামাল দিতে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছে চাল, ডাল, তেল সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছায় করের অর্থ।
4. খাদ্যশস্য নিরাপত্তা মজুত: দুর্যোগের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি খাদ্যশস্য কিনে জাতীয় গুদামজাত বজায় রাখে।
5. জরুরি কৃষি ঋণ সহায়তা: প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে কৃষি ঋণ মওকুফ বা নতুন প্রণোদনা দিতে রাষ্ট্রীয় তহবিল কাজ করে।
সামাজিক সুরক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ
1. বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা: সমাজের অসহায় প্রবীণ নাগরিক ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের মাসিক সামাজিক ভাতা প্রদান করা হয়।
2. প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের সহায়তা: বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র।
3. প্রসূতি ও মাতৃত্বকালীন আর্থিক সমর্থন: নিম্নআয়ের মা ও নবজাতকের সঠিক পুষ্টির জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাত থেকে অনুদান দেওয়া হয়।
4. টিআর, কাবিখা ও আশ্রয়ণ প্রকল্প: ভূমিহীনদের ঘর তৈরি এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য/টাকা কর্মসূচির মূল জোগান আসে জাতীয় রাজস্ব থেকে।
5. জরুরি দুর্যোগকালীন ত্রাণ: আকস্মিক বন্যা, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বা খরায় দ্রুত খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণে ট্যাক্সের টাকা ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা
1. অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: দেশের ভেতরে নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়।
2. সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা: ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) পরিচালনা ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কেনা হয়।
3. ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি উদ্ধারকাজ: অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস ও অন্যান্য আকস্মিক দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে সক্ষম রাখা সম্ভব হয়।
4. আদালত ও বিচার বিভাগ পরিচালনা: বিচারপ্রার্থী নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালতগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় মেটায় কর।
5. ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সাইবার নিরাপত্তা: সাইবার অপরাধ দমন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা অবকাঠামো তৈরিতে রাষ্ট্রের সংগৃহীত কর কাজ করে।
প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত ও আইনি লাভ
1. বিনিয়োগ রেয়াত: সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, শেয়ারবাজার বা জীবন বীমায় টাকা বিনিয়োগ করলে আইনিভাবে প্রদেয় আয়করের ওপর সরাসরি ছাড় পাওয়া যায়।
2. ৫০টির বেশি নাগরিক সেবায় সুবিধা: ব্যাংক লোন অনুমোদন, ৫ লাখ টাকার বেশি ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ফ্ল্যাট/জমি রেজিস্ট্রেশনে ই-রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক।
3. সম্পত্তি ও আয়ের আইনি বৈধতা: সঠিক নিয়ম মেনে ট্যাক্স ও ভ্যাট দিলে অর্জিত সম্পত্তি সম্পূর্ণ আইনি হিসেবে নিবন্ধিত থাকে, ফলে এনবিআরের জরিমানের ভয় থাকে না।
4. সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যাংকিং ঋণ: নিয়মিত কর দাখিলকারী নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সেক্টর স্বনামধন্য গ্রাহক হিসেবে কম সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত ঋণ দেয়।
5. নতুন করদাতাদের বিশেষ ছাড়: প্রথমবার ই-রিটার্ন জমাদানকারী নতুন নিবন্ধিত করদাতাদের উৎসাহিত করতে সর্বনিম্ন কর শিথিল করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবৃদ্ধি
1. ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার বৈধতা: ট্যাক্স ও ভ্যাট পরিপালন নিশ্চিত করলে প্রতিষ্ঠানের আইনি স্থায়িত্ব বাড়ে এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্স নবায়ন সহজ হয়।
2. আন্তর্জাতিক টেন্ডার ও চুক্তি লাভ: সঠিক ভ্যাট চালান (মুশক ৬.৩) প্রদানকারী কোম্পানিগুলো বড় বড় দেশি-বিদেশি বহুজাতিক চুক্তি ও সরকারি কাজের যোগ্য বিবেচিত হয়।
3. কর্পোরেট করহারে বিশেষ সুবিধা: ব্যাংকিং চ্যানেল ও ডিজিটাল মাধ্যমে স্বচ্ছ লেনদেনকারী নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট করহারে ছাড় দেওয়া হয়।
4. রপ্তানি খাতে প্রণোদনা ও ডিউটি ড্রব্যাক: দেশে তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করলে সরকার ব্যবসায়ীদের বিশেষ নগদ প্রণোদনা ও শুল্ক ছাড় দিয়ে থাকে।
5. সহজ ব্যবসা পরিবেশ: আধুনিক ট্যাক্স অটোমেশন ব্যবস্থার ফলে বাণিজ্যিক অডিট ও ফাইল প্রসেসিংয়ের অপচয় রোধ হয়।
সামষ্টিক অর্থনীতি, সাম্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
1. প্রগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন (সামাজিক সমতা): আয়ের ভিত্তিতে প্রগ্রেসিভ কর ধার্য করে ধনীদের থেকে বেশি কর নিয়ে দরিদ্রদের সেবায় ব্যয় করে বৈষম্য কমানো হয়।
2. পরোক্ষ করের (ভ্যাট) চাপ কমানো: সরাসরি আয়কর বেশি আদায় হলে সরকার প্রাত্যহিক নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাটের হার কম রাখার সুযোগ পায়, যা মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেয়।
3. মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধ: সরকার ব্যাংক থেকে নতুন অতিরিক্ত নোট না ছাপিয়ে সংগৃহীত রাজস্ব দিয়ে বাজেট মেটালে বাজারে জিনিসপত্রের দাম শান্ত থাকে।
4. কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত সম্পদের দৌরাত্ম্য হ্রাস: ডিজিটাল ই-রিটার্ন ও ব্যাংকিং ডাটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয়ের প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।
5. স্মার্ট ও ক্যাশলেস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ডিজিটাল পেমেন্ট পোর্টালে কেনাকাটা ও লেনদেন উৎসাহিত করার মাধ্যমে একটি আধুনিক স্মার্ট আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হয়।
জাতীয় অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও বৈশ্বিক মর্যাদা
1. বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ ও পরনির্ভরশীলতা হ্রাস: জনগণ নিয়মিত কর দিলে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ কমে যায়।
2. আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং উন্নয়ন: কর-জিডিপি অনুপাত ভালো থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং শক্তিশালী হয়, যা দেশে বড় মাপের বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।
3. নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও নতুন সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের তরুণদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয়।
4. ডিজিটাল গভর্নেন্স সার্ভিস প্রবর্তন: ই-পাসপোর্ট, অনলাইন এনআইডি সার্ভিস, ডিজিটাল সাব-রেজিস্ট্রি এবং স্বয়ংক্রিয় নাগরিক সার্ভিসগুলো করের অর্থেই সম্প্রসারিত হয়।
5. আত্মনির্ভরশীল ও সম্মানজনক রাষ্ট্র গঠন: সময়মতো কর ও ভ্যাট প্রদানের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্র গঠনের সরাসরি অর্থনৈতিক অংশীদার হন এবং একটি স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার মূল কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশে আয়কর এবং ভ্যাট না দিলে বা রাজস্ব ফাঁকি দিলে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত মারাত্মক ঝুঁকি ও ক্ষতির সৃষ্টি হয়। নাগরিক ও রাষ্ট্র পর্যায়ে কী কী ক্ষতি ও ঝুঁকি রয়েছে তার বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:
ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক পর্যায়ের প্রত্যক্ষ ক্ষতি ও ঝুঁকি
1. ভারী আইনি জরিমানা ও বিলম্বে সুদ: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন না দিলে বা আয় গোপন করলে আয়কর আইন অনুযায়ী প্রদেয় করের ওপর বিপুল অঙ্কের আইনি জরিমানা এবং বিলম্ব সুদ আরোপিত হয়।
2. ব্যাংক হিসাব সাময়িক স্থগিত: বড় অঙ্কের কর ফাঁকি বা রাজস্ব গোপন ধরা পড়লে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করে লেনদেন বন্ধ করে দিতে পারে।
3. ব্যাংক ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড প্রাপ্তিতে বাধা: ই-রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র না থাকলে ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক লোন, ব্যক্তিগত লোন বা ক্রেডিট কার্ড পাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।
4. ব্যাংক ডিপোজিটে বেশি হারে উৎসে কর কাটা: ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা সঞ্চয়ী হিসাবে অর্জিত সুদের ওপর রিটার্ন জমার প্রমাণ না থাকলে সাধারণের চেয়ে ৫% থেকে ১০% বেশি হারে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়।
5. সম্পত্তি কেনাবেচায় অতিরিক্ত করের বোঝা: জমি, ফ্ল্যাট বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনের সময় আয়কর দাখিলের প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে না পারলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত উৎসে কর গুণতে হয়।
6. ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে জটিলতা: ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন সাবমিটের প্রমাণ ছাড়া স্থানীয় পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা যায় না, ফলে ব্যবসায়িক বৈধতা নষ্ট হয়।
7. অপ্রদর্শিত বা "কালো টাকা" হিসেবে চিহ্নিত হওয়া: নিয়মিত কর না দিয়ে অর্জিত সমস্ত সম্পদ আইনিভাবে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা হিসেবে গণ্য হয়, যা যেকোনো সময় এনবিআরের স্পেশাল অডিটে বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
8. এনবিআরের আইনি নোটিশ ও ট্রাইব্যুনালে মামলা: ইচ্ছাকৃত রাজস্ব গোপন করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অডিট সেকশন থেকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয় এবং আয়কর ট্রাইব্যুনালে ফৌজদারি মামলা দায়ের হতে পারে।
9. কর্পোরেট সুনাম ও বড় চুক্তি হাতছাড়া: ভ্যাট চালান (মুশক ৬.৩) এবং করপোরেট ফাইল না থাকলে যেকোনো প্রতিষ্ঠান বড় বহুজাতিক চুক্তি, সরকারি টেন্ডার বা সাপ্লাই চেইন থেকে বাদ পড়ে যায়।
10. ভ্যাট ট্র্যাকে ডিজিটাল জরিমানা: দোকানে কেনাকাটায় ভ্যাট চালান না দিলে বা অটোমেটেড ডিজিটাল ট্র্যাকিং ফাঁকি দিলে বড় অঙ্কের আইনি জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা হতে পারে।
11. পেশাগত লাইসেন্স বাতিল বা আটকে যাওয়া: ডাক্তার, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রকৌশলী ও স্থপতিদের ট্যাক্স ফাইল জমা না থাকলে পেশাগত প্র্যাকটিস লাইসেন্স নবায়ন আটকে যায়।
12. বিদেশ ভ্রমণ ও ভিজিট ভিসায় বাধা: বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ থাকলে বা স্পেশাল ওয়াচ লিস্টে নাম উঠলে বিদেশে গমন বা ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
13. শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডে সুযোগ নষ্ট: পুঁজিবাজারে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি শেয়ার ধারণ বা লভ্যাংশ তুলতে গেলে ট্যাক্স রিটার্ন জমার বাধ্যতামূলক শর্ত পরিপালন করতে হয়।
14. যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নবায়নে বাধা: ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিকদের রিটার্ন জমার প্রমাণ ছাড়া বিআরটিএ থেকে গাড়ির ফিটনেস ও রুট পারমিট নবায়ন করা যায় না।
15. জাতীয় সম্মাননা ও রাষ্ট্রীয় পদক প্রাপ্তিতে যোগ্যতা হারানো: শীর্ষ ব্যবসায়ী বা পেশাজীবী হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত করদাতা না হলে সরকারের কোনো সিআইপি মর্যাদা বা জাতীয় সম্মাননা পাওয়া যায় না।
16. বিনিয়োগ রেয়াতের সুযোগ হাতছাড়া: সময়মতো কর জমা না দিলে সরকার অনুমোদিত খাতগুলোতে (DPS, সঞ্চয়পত্র) বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাপ্ত বড় অঙ্কের ট্যাক্স ছাড় হারায়।
17. পারিবারিক বা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে আইনি জটিলতা: কর ফাঁকি দিয়ে অর্জিত সম্পদ উত্তরাধিকারীদের নামে হস্তান্তর করতে গেলে আইনি ট্রাইব্যুনাল ও এনবিআরের জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
18. উৎসে কাটা অতিরিক্ত ট্যাক্স রিফান্ড না পাওয়া: ব্যাংকে বা চাকরিতে আগাম কেটে রাখা অতিরিক্ত ট্যাক্সের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
19. ব্যবসার ইজ অফ ডুইং বিজনেস নষ্ট: ভ্যাট ও ট্যাক্সের ফাইল ঠিক না থাকলে বার্ষিক বাণিজ্যিক অডিট ব্যর্থ হয়, যা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী বাজারমূল্য কমিয়ে দেয়।
20. ব্যক্তিগত সামাজিক মর্যাদা ও আস্থার বিনাশ: আর্থিক লেনদেনে অস্বচ্ছতা ও কর ফাঁকিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হলে ব্যাংক, অংশীদার ও ব্যবসায়িক মহলে নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট হয়।
জাতীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি
1. জাতীয় বাজেটে বিশাল ঘাটতি তৈরি: প্রাক্কলিত আয়কর ও ভ্যাট সংগৃহীত না হলে বার্ষিক জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়।
2. মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হওয়া: প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে মেট্রোরেল, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর ও ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ এবং নিয়মিত মেরামত থমকে যায়।
3. বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ ও চড়া সুদের বোঝা: রাজস্ব কম হলে সরকারকে বাজেট মেটাতে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়, যার ঋণের কিস্তি জাতিকে বহু বছর বইতে হয়।
4. নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি: রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত নতুন টাকা ছাপাতে বাধ্য হয়, যার ফলে বাজারে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম চরম বৃদ্ধি পায়।
5. পরোক্ষ করের (ভ্যাট) চাপ গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর পড়া: সরাসরি আয়কর আদায় না হলে সরকার প্রাত্যহিক সাধারণ পণ্যের ওপর ভ্যাটের হার বাড়াতে বাধ্য হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
6. কৃষি খাতের সারে ভর্তুকি কমানোর বাধ্যবাধকতা: রাজস্ব আয় কমে গেলে সরকার কৃষি খাতের সার, ডিজেল ও বীজের ভর্তুকি কমাতে বাধ্য হয়, যার ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে খাদ্যদ্রব্য মহার্ঘ হয়।
7. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লোকসান ও দাম বৃদ্ধি: বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারের দেওয়া কোটি কোটি টাকার বাজেট ভর্তুকির অর্থ না থাকায় বিশ্ববাজারের ধাক্কায় স্থানীয় দাম বাড়াতে হয়।
8. সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসা সংকট: রাজস্বের অভাবে স্বাস্থ্য বাজেটে ছাঁটাই করতে হয়, ফলে দরিদ্র নাগরিক সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যের ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
9. বিনামূল্যে বই ও উপবৃত্তি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি: রাজস্ব সংকট দেখা দিলে কোটি কোটি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ও উপবৃত্তি কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে।
10. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সংকুচিত হওয়া: কর না দিলে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও টিসিবি-র স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমের তহবিল কমে যায়।
11. অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি বৃদ্ধি: ট্যাক্স না দেওয়ার সংস্কৃতি সমাজে আনঅফিসিয়াল ক্যাশ লেনদেন বাড়িয়ে আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তোলে।
12. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ক্রেডিট রেটিং ধস: কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী হলে বৈশ্বিক রেটিং সংস্থা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে।
13. বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দুর্বল রাজস্ব কাঠামো দেখে বহুজাতিক বড় কোম্পানিগুলো দেশে নতুন শিল্প কারখানা নির্মাণে অনীহা প্রকাশ করে।
14. নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হওয়া: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আইটি হাইটেক পার্ক গড়ার টাকা না থাকলে দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণের নতুন চাকরির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
15. জরুরি দুর্যোগে দ্রুত ত্রাণ অর্থায়নের অভাব: আকস্মিক বন্যা, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বা মহামারির সময়ে সরকারের নিজস্ব তহবিল না থাকায় দ্রুত ত্রাণ বিতরণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সুশাসন, সামাজিক সমতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি
1. ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ: ধনীদের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকলে সমাজে অল্প কিছু মানুষের হাতে সমস্ত সম্পদ পুঞ্জীভূত হয় এবং নিম্নবিত্তরা আরও দরিদ্র হয়।
2. কালো টাকার বিস্তার ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি: রাজস্ব ফাঁকির অপ্রদর্শিত টাকা অবৈধ কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি, হুন্ডি ব্যবসা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
3. মানি লন্ডারিং ও বিদেশে টাকা পাচারের ঝুঁকি: সঠিক করের আওতায় না আনা অবৈধ সম্পদ খুব সহজেই হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খালি করে ফেলে।
4. স্মার্ট ও ডিজিটাল গভর্নেন্স সেবা সম্প্রসারণে ধীরগতি: ই-পাসপোর্ট, অনলাইন এনআইডি, ডিজিটালাইজড সাব-রেজিস্ট্রির মতো স্মার্ট সার্ভিস চালু ও উন্নত রাখা রাজস্ব আয় ছাড়া অসম্ভব।
5. শিক্ষা ব্যবস্থার মান বজায় রাখা অসম্ভব হওয়া: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকায় দেশে বিশ্বমানের শিক্ষা ও উদ্ভাবন থমকে যায়।
6. আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা: পুলিশ, বিজিবি ও নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি সরঞ্জাম ক্রয় এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয় না।
7. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার তহবিল সংকুচিত হওয়া: পরিবেশ সুরক্ষা, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও নদী ভাঙন রোধে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
8. ব্যবসা-বাণিজ্যে অসামঞ্জস্য ও অসাধু প্রতিযোগিতা: সততার সঙ্গে ট্যাক্স-ভ্যাট দেওয়া বৈধ ব্যবসায়ী এবং ফাঁকিবাজ অসাধু ব্যবসায়ীদের মাঝে বাজারে অসমান ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
9. পাবলিক সার্ভিস ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা: রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার মান ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যবস্থার প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা প্রকাশ করে।
10. সরকারি খাতের অদক্ষতা বৃদ্ধি: বাজেট ঘাটতির কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সামাল দেওয়া ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া ব্যাহত হয়।
11. বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে দরকষাকষির ক্ষমতা হ্রাস: বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দরকষাকষিতে রাষ্ট্র দুর্বল অবস্থানে পড়ে যায়।
12. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চড়া সুদের ঋণের বোঝা সমর্পণ: সাময়িক কর ফাঁকির ফলে তৈরি হওয়া ঘাটতি মেটাতে নেওয়া ঋণের কিস্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুদে-আসলে তিল তিল করে মেটাতে হয়।
13. পরোক্ষ সুবিধা ও নাগরিক অধিকার চাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস: নাগরিক নিজে দায়িত্ব নিয়ে কর না দিলে রাষ্ট্রের সুশাসন বা মানসম্মত নাগরিক সেবার দাবি তোলার আইনি ও নৈতিক অধিকার দুর্বল হয়ে যায়।
14. আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য বৃদ্ধি: সুষম রাজস্ব না থাকলে অনগ্রসর ও দূরবর্তী জেলাগুলোতে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন থমকে যায়।
15. একটি আত্মমর্যাদাহীন ও দুর্বল অর্থনীতির সৃষ্টি: কর ও ভ্যাটের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ না থাকলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে ওঠে না, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে জনগণের প্রদত্ত আয়কর এবং মূল্যসংযোজন করের অর্থ সঠিক ও কার্যকর উপায়ে উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
নাগরিকদের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, তা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
বাজেট ও খরচের তথ্যের সহজীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন
1. নাগরিক বাজেট প্রকাশ: সাধারণ নাগরিক যেন জটিল অর্থনৈতিক পরিভাষা ছাড়াই সহজে বুঝতে পারেন, সেজন্য প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের সঙ্গে গ্রাফ ও চিত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ভাষায় একটি "নাগরিক বাজেট" প্রকাশ করা।
2. পার্সোনাল ট্যাক্সপেয়ার ড্যাশবোর্ড: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রতিটি করদাতার জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা, যেখানে দেখানো হবে তাঁর দেওয়া আয়করের কত শতাংশ শিক্ষায়, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামোতে ব্যয় হয়েছে।
3. অনলাইন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট: সরকারের সমস্ত কেনাকাটা ও মেগা প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটাল সেন্ট্রাল সিস্টেমে পরিচালনা করা, যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম ছাড়া সর্বনিম্ন খরচে মানসম্মত কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
অডিট ও আইনি জবাবদিহিতা সুদৃঢ়করণ
1. সিএজি অডিট রিপোর্ট উন্মুক্তকরণ: সরকারের প্রতিটি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ব্যয় সংক্রান্ত মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট জাতীয় সংসদে পেশ করার পাশাপাশি সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের দেখার জন্য সরাসরি প্রকাশ করা।
2. পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির গণশুনানি: জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সংক্রান্ত সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক ও অডিট পর্যালোচনার বিবরণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করা।
3. স্বাধীন তদন্ত কমিশন ও দৃশ্যমান শাস্তি: অডিট রিপোর্টে কোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বাজেট অপচয় বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে স্বাধীন অডিট কমিশন গঠন করে দ্রুত তদন্ত করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণ
1. উন্মুক্ত গণশুনানি ও টাউন হল মিটিং: সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে স্থানীয় ট্যাক্সের টাকা কোন কোন অবকাঠামো বা সামাজিক সেবায় খরচ হবে, সে বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত ও প্রশ্ন করার জন্য নিয়মিত উন্মুক্ত গণশুনানির আয়োজন করা।
2. সামাজিক নিরীক্ষা: গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর (যেমন: বয়স্ক ভাতা, টিসিবি খাদ্য বিতরণ) বাস্তবায়িত কাজ স্থানীয় জনতা ও যুবসমাজকে দিয়ে সরেজমিনে যাচাই বা সামাজিক নিরীক্ষা করানোর নিয়ম চালু রাখা।
তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ ও প্রচার
1. তথ্য অধিকার আইনের সহজ প্রয়োগ: যেকোনো সরকারি প্রকল্পের নির্ধারিত বাজেট, ঠিকাদারি চুক্তি ও প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব যেকোনো নাগরিক যেন তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সহজে ও দ্রুত পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।
2. প্রকল্পের স্থানে বিস্তারিত তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড: প্রতিটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণস্থলে প্রাক্কলিত বাজেট, কাজের মেয়াদ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর যোগাযোগের তথ্যসংবলিত স্থায়ী সাইনবোর্ড দৃশ্যমানভাবে টাঙিয়ে রাখা।
সরকার যখন প্রযুক্তির ব্যবহারে কর ব্যয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করবে এবং স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করবে, তখন দেশের নাগরিকদের মনে কর প্রদানের স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ববোধ ও গভীর আস্থা তৈরি হবে। এই স্বচ্ছতাই বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর করার প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশ, মেগা অবকাঠামো নির্মাণ, জনকল্যাণমূলক সেবা সচল রাখা এবং একটি আত্মনির্ভরশীল বাজেট অর্থায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো নাগরিকদের সময়মতো পরিশোধিত আয়কর ও ভ্যাট। সংগৃহীত এই রাজস্বের মাধ্যমেই দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। সঠিক নিয়মে কর পরিপালন করলে নাগরিকরা যেমন আইনগত সুরক্ষা, ট্যাক্স রেয়াত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় সহজে প্রবেশাধিকার পান, তেমনি নিয়মিত কর না দিলে আইনি জরিমানা, ব্যাংক হিসাব স্থগিতকরণ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের মারাত্মক সংকট তৈরি হয়। জনগণের এই কষ্টার্জিত অর্থের শতভাগ সঠিক ব্যবহার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিক বাজেট প্রকাশ, ডিজিটাল ই-প্রকিউরমেন্ট, সিএজি অডিট এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত গণশুনানির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্র যখন আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কর ব্যয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব জনসমক্ষে স্বচ্ছ রাখে এবং দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে তা সঠিক খাতে ব্যয় করে, তখন করদাতাদের মাঝে কর প্রদানে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও গভীর আস্থা তৈরি হয়। পরিশেষে, জনগণের সচেতন ও সৎ কর পরিপালন এবং সরকারের দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহিতামূলক খরচের সুষম সমন্বয়েই কেবল গড়ে উঠতে পারে একটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, সুশাসিত ও উন্নত বাংলাদেশ।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗