কমিশনভিত্তিক চাকরির প্রলোভনে নিয়োগের অভিযোগ; অফিসকক্ষে নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির দাবি ভুক্তভোগীদের।
চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানাধীন ফ্রি-পোর্ট এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসকক্ষে দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা এ বি এমরানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী দুই তরুণীর অভিযোগের পর পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করে থানায় নিয়ে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ফ্রি-পোর্ট চৌধুরী মার্কেটের পাশে গাজী কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলায় অবস্থিত তিয়েনশী বাংলাদেশ কোং লিমিটেডের কার্যালয়ে। অভিযুক্ত এ বি এমরান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ব্রোঞ্জ লায়ন পদে কর্মরত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কমিশনভিত্তিক চাকরির প্রলোভনে প্রায় ১২ দিন আগে তাঁরা ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের একজন এবং পরবর্তীতে অন্যজন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগী দুই তরুণী হলেন শারমিন আক্তার ও বৃষ্টি আক্তার (প্রায় ১৮)। শারমিন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার বাতিয়াপাড়া এলাকার আব্দুল কাদেরের মেয়ে এবং বৃষ্টি খুলনার বাগেরহাট এলাকার মো. ফারুকের মেয়ে বলে জানা গেছে।
মোবাইল ফোন চার্জে দিতে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ
ভুক্তভোগী শারমিন আক্তারের অভিযোগ, ঘটনার দিন প্রতিদিনের মতো তিনি গাজী কমপ্লেক্সে অবস্থিত তিয়েনশী বাংলাদেশ কোং লিমিটেডের অফিসে যান। একপর্যায়ে তাঁর মুঠোফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে তিনি সেটি চার্জে দিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে ফোন আনতে গেলে এ বি এমরান কক্ষের দরজা বন্ধ করে তাঁকে জাপটে ধরেন এবং দুই হাত চেপে ধরে মেঝেতে ফেলে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। শারমিনের আরও অভিযোগ, এ ঘটনা কাউকে জানালে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পাশাপাশি এলাকার সন্ত্রাসীদের দিয়ে ফ্রি-পোর্ট এলাকা থেকে বের করে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়।
তিনি জানান, ঘটনার পর ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় অপর ভুক্তভোগী বৃষ্টি আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ইপিজেড থানায় যান। সেখানে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁদের ফ্রি-পোর্ট মোড়ে এএসআই সোহেলের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
পরবর্তীতে স্থানীয় সাংবাদিকেরা তাঁদের কাছ থেকে ঘটনা শুনে দুজনকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে যান এবং পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে অভিযুক্ত এ বি এমরানকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় বলে তাঁদের দাবি।
বাসাভাড়া দিতে না পেরে অফিসে আশ্রয়, পরে ধর্ষণের অভিযোগ
অপর ভুক্তভোগী বৃষ্টি আক্তারের অভিযোগ, শারমিনের সঙ্গে একই সময়ে দালালের মাধ্যমে তিনি কমিশনভিত্তিক চাকরিতে যোগ দেন। গত ৪ অক্টোবর বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বাড়িওয়ালা তাঁকে ঘর ছেড়ে দিতে বলেন। বিষয়টি তিনি এ বি এমরানকে জানালে ওই কর্মকর্তা তাঁকে রাতে অফিসে থাকতে বলেন এবং পরদিন ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
বৃষ্টির দাবি, এরপর অভিযুক্ত কর্মকর্তা তাঁকে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে অফিসকক্ষে রেখে চলে যান। রাত আনুমানিক ১২টা থেকে ১টার মধ্যে ওই বন্ধু তাঁকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে রাত আনুমানিক ২টার দিকে এ বি এমরান এসে তাঁকেও ধর্ষণ করেন বলে তাঁর অভিযোগ।
বৃষ্টি আরও জানান, এ সময় চিৎকার করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাঁর বন্ধু মুখ চেপে ধরেন। ঘটনাটি কাউকে জানালে প্রাণে মেরে ফেলা এবং চট্টগ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অফিসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, ওই অফিসে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তাঁর অভিযোগ, ইপিজেড এলাকার ভেতর থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কমিশনভিত্তিক চাকরির কথা বলে তরুণীদের সেখানে আনা হয়। পরে তাঁদের টাকা-পয়সা, মুঠোফোন ও কানের দুলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ওই ব্যক্তির আরও দাবি, প্রতিষ্ঠানটির পণ্য বিক্রির নামে অসহায় নারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। এ কাজে অভিযুক্ত কর্মকর্তা, তাঁর বড় ভাই ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালালদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযুক্তের বক্তব্য ও অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত এ বি এমরানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিষয়টি মীমাংসার জন্য সাংবাদিকদের ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন অভিযুক্ত এমরান। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না বলে সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি প্রতিবেদকের কাছে।
থানার ও কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গাজী কমপ্লেক্সের ইনচার্জ বাবু জানান, সংশ্লিষ্ট অফিস কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে এবং অফিস ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ওই অফিসে প্রায়ই ছোটখাটো ঝামেলা ও বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়।
অফিস বন্ধ ও তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর
এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ না হলে আরও অনেক অসহায় নারী প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তদন্ত, অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
উল্লেখ্য, ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, মামলা দায়েরের তথ্য এবং চিকিৎসা বা অন্যান্য তদন্তসংক্রান্ত তথ্য পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।
The post চট্টগ্রাম ইপিজেডে দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তা আটক appeared first on দৈনিক আমার সময়.
