গত ২০ বছর উন্নয়নবঞ্চিত ও একসময়ের জলাধারবেষ্টিত এ এলাকায় মানুষের বসতি ও আনাগোনা বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সড়ক, ড্রেনেজসহ নাগরিক অবকাঠামো।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পেছনেই বাউনিয়া-বটতলা। এক পাশে আধুনিক উত্তরা মডেল টাউন, অন্য পাশে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যস্ত নগরজীবন। অথচ এসবের পাশেই থাকা এ জনপদের চিত্র ভিন্ন। গত ২০ বছর উন্নয়নবঞ্চিত ও একসময়ের জলাধারবেষ্টিত এ এলাকায় মানুষের বসতি ও আনাগোনা বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সড়ক, ড্রেনেজসহ নাগরিক অবকাঠামো। এখন পুরনো ঘাটতি পূরণে উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু একই সময়ে দুটি প্রধান সড়কে পৃথক দুটি সংস্থার প্রকল্প চলায় উন্নয়নের মধ্যেই নতুন ভোগান্তিতে পড়েছে বাসিন্দারা।
বাউনিয়া বটতলা থেকে একদিকে বাউনিয়া মেইন সড়ক চলে গেছে ইসিবি চত্বরের দিকে, অন্যদিকে বাদালদী সড়ক যুক্ত হয়েছে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের সঙ্গে। সেখান থেকে উত্তরা ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের পাশাপাশি মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতেও সহজে পৌঁছা যায়। গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথের কাছাকাছি হলেও সড়ক দুটির দীর্ঘদিনের দুরবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। কোথাও সড়ক খুঁড়ে চলছে পানির পাইপলাইন স্থাপনের কাজ, কোথাও ড্রেনেজ নির্মাণের জন্য রাস্তা ও ফুটপাত কাটা। কাদাপানি, গর্ত ও নির্মাণসামগ্রীতে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল, ঝুঁকি নিয়ে চলছে পথচারীরাও।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাউনিয়া (আংশিক), বাউনিয়া বটতলা ও বাদালদী এলাকা ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৬ সালের ৯ মে সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে তৎকালীন হরিরামপুর ইউনিয়ন থেকে এলাকাগুলো ডিএনসিসির আওতাভুক্ত হয়। তবে সিটি করপোরেশনের আওতায় এলেও দীর্ঘদিন এ এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে এখন শুরু হয়েছে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প। তবে প্রকল্প চলাকালে সড়ক ব্যবহারযোগ্য রাখার ব্যবস্থা না থাকায় পুরনো দুর্ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণকাজের ভোগান্তি।
উত্তরা জসীমউদ্দীন সড়কের পশ্চিমে পাকার মাথা থেকে শুরু হয়ে বাউনিয়া বটতলা বাজার হয়ে শাহ সুলতান মার্কেট রোড পর্যন্ত বাউনিয়া মেইন সড়কের বিভিন্ন অংশে চলছে ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ। গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পের আওতায় সড়ক খুঁড়ে বসানো হচ্ছে এ পাইপলাইন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ঢাকা ওয়াসার অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চায়না জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।
পাইপলাইনটি উত্তরা এলাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা। এর একটি অংশ জসিম উদ্দিন সড়কের পানি সরবরাহের পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। উত্তরা এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাইমারি বিতরণ পাইপলাইন স্থাপনের কাজও চলছে। ফলে বাউনিয়া থেকে জসীমউদ্দীন সড়ক পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে উন্নয়নকাজের প্রভাব পড়েছে।
জসীমউদ্দীন সড়কের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হলেও সড়কের মাঝখানে খোঁড়া অংশে এখনো পুরোপুরি পিচ বসানো হয়নি। এতে যানবাহন চলাচলের সময় কাটা অংশে চাকা হেলে যাওয়া বা গর্তে দেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট যানবাহনকে ওই অংশ দিয়ে চলাচলে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা বাউনিয়া বটতলা থেকে ইসিবি চত্বরমুখী বাউনিয়া প্রধান সড়কে। মেইন সড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি জমে আছে পানি ও কাদা। কোথাও বড় গর্ত, কোথাও পানিতে তলিয়ে থাকা সড়কের অংশ। পানির নিচে গর্ত থাকায় রাস্তার গভীরতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়ই প্রতিদিন নানা রকম দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
সরজমিনে বাউনিয়া বটতলা থেকে ইসিবি চত্বরমুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে এমন চিত্র দেখা গেছে। অটোরিকশা, পণ্যবাহী ছোট পিকআপ ও ট্রাককে পানি-কাদা পেরিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। কোথাও রাস্তার ওপর ছড়িয়ে আছে ইট-সুরকি ও নির্মাণসামগ্রী। এতে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পথচারীদেরও চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ এলাকায় পাইপলাইন স্থাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইপলাইন বসানোর কাজ শুরু হয়েছে প্রায় বছর পেরিয়ে গেছে। বিভিন্ন ধাপে নির্ধারিত অংশের কাজ শেষ করে পরের অংশের জন্য কাজ ধরতে হয়, এতে সময় বেশি লাগে। তবে পাইপলাইন স্থাপন শেষ হওয়ার পর প্রেসার টেস্ট করার পর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আরো কিছু কাজ করার পর এ রাস্তা ডিএনসিসিকে বুঝিয়ে দেয়া হবে। এ কাজে সংশ্লিষ্ট ওয়াসার এক কর্মী বলেন, ‘পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। কবে নাগাদ শেষ হবে বলতে পারছি না। তবে পাইপলাইন বসানো শেষ হলে প্রেসার টেস্ট করার পর আমরা এটি ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করব। কিছুদিন ভোগান্তি হয়তো হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু বর্ষা মৌসুমেই নয়, বছরের বিভিন্ন সময় সড়কের কয়েকটি অংশে পানি জমে থাকে। উন্নয়নকাজ চলার কারণে দীর্ঘ সময় সড়কের অংশবিশেষ খোঁড়া থাকায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাউনিয়া বটতলা থেকে বাদালদী হয়ে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের দিকে যাওয়া সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। দীর্ঘদিন অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত এ সড়কে বর্তমানে ডিএনসিসির ড্রেনেজ, সড়ক ও ফুটপাত উন্নয়নের সমন্বিত কাজ চলছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাউনিয়া এলাকাটি পরিকল্পিত নগর এলাকার বাইরে গড়ে উঠেছে। ঢাকার নগর পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পিত এলাকায় যেভাবে সেবা ও সুযোগ-সুবিধা দ্রুত পৌঁছায়, অপরিকল্পিত বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে ওঠা এলাকাগুলোতে সেভাবে সেবাগুলো যায় না, গেলেও অনেক দেরি হয় এবং এতে সে এলাকার মানুষ বঞ্চিত হয়।’
