চট্টগ্রামে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি ঘিরে গুরুতর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ধার করা ইয়াবার মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার পিস জব্দ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে
জব্দ দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার
নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি ঘিরে গুরুতর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ধার করা ইয়াবার মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার পিস জব্দ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পশ্চিম জোনের ৪২ নম্বর টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি ১ লাখ ২৭ হাজার পিস ইয়াবার কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিবির পশ্চিম জোনের ৪২ নম্বর টিমের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মোস্তফা কামাল ও তার নেতৃত্বাধীন অভিযানকারী দল। পটিয়া থানার শান্তির হাট এলাকা থেকে আইডিয়াল পরিবহনের একটি বাস আটক করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পর যাত্রীদের ছেড়ে দেওয়া, বাসটি অন্য এলাকায় নিয়ে জব্দ দেখানো এবং পরে মাত্র ১৩ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য দিয়ে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযানে অংশ নেওয়া দলের একজন সদস্যকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাত ১২টার দিকে ডিবি পুলিশের পশ্চিম জোনের ৪২ নম্বর টিমের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালায়। দলের অন্য সদস্যরা হলেন এসআই জাহিদুল হাসান, এসআই শাহাবুদ্দিন খন্দকার, এসআই মামুন, এএসআই রবিউল আলম ও এএসআই লুৎফর রহমান।
অভিযোগকারীদের দাবি, পটিয়া থানার শান্তির হাট এলাকা থেকে আইডিয়াল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস আটক করা হয়। পরে বাসটি নগরীর নতুন ব্রিজ এলাকায় নিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় বাসের ভেতরে তৈরি করা বিশেষ চেম্বার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে মামলার নথিতে মাত্র ১৩ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে উল্লিখিত ১ লাখ ৪০ হাজার পিসের সঙ্গে নথিতে উল্লেখ করা ১৩ হাজার পিসের হিসাব তুলনা করলে ১ লাখ ২৭ হাজার পিসের ব্যবধান পাওয়া যায়। এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট হিসাব বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, বাস থেকে ইয়াবা উদ্ধারের পর যাত্রীদের মধ্যে তিনজন ছাত্রের নাম-ঠিকানা সাদা কাগজে লিখে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর যাত্রীদের নতুন ব্রিজ এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয় এবং পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে অন্য গাড়িতে করে চলে যেতে বলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাসের চালককে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। পরে বাসটির হেলপারকে দিয়ে গাড়িটি চালিয়ে নগরীর খুলশী থানাধীন গরিবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকায় নেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সেখানে বাসটি জব্দ দেখিয়ে ১৩ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
বাসটি পটিয়া থানার শান্তির হাট এলাকা থেকে আটক করা হলেও পরে নগরীর অন্য এলাকায় নিয়ে জব্দ দেখানো এবং খুলশী থানায় মামলা দায়েরের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর খুলশী থানায় মামলা নম্বর ২৭ দায়ের করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) ধারার সারণি ১০(গ), ৩৮ ও ৪১ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো অভিযানে এক থানা এলাকা থেকে অন্য এলাকায় আসামি বা আলামত নেওয়া হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি হয়ে যায়-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যে দলের সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করেছেন, সেই দলের এসআই মামুনকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ নিয়ে যখন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তখন অভিযান পরিচালনা, আলামত জব্দ এবং মামলার তদন্ত-প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই অভিযানে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তার হাতে তদন্তের দায়িত্ব থাকলে তার ভূমিকা ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ কারণে অভিযোগকারীরা প্রয়োজনে অন্য কোনো নিরপেক্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্তের বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। ভিডিওতে ধারণ করা দৃশ্যের সঙ্গে মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা, আলামত জমা দেওয়ার রসিদ এবং প্রয়োজনে আদালতে উপস্থাপিত নথি মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা ইয়াবার নমুনা, প্যাকেটের সংখ্যা ও ওজনসংক্রান্ত তথ্য এবং মালখানার রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি পুলিশের পশ্চিম জোনের ৪২ নম্বর টিমের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “১৩ হাজার পিস পাওয়া গেছে। যা পেয়েছি, তা দিয়ে মামলা হয়েছে।”
তবে অভিযোগে উল্লিখিত ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি এবং নথিতে ১৩ হাজার পিস জব্দ দেখানোর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার পিসের যে ব্যবধানের কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে তার বক্তব্যে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের দাবি এবং পরে তার তুলনায় অনেক কম পরিমাণ জব্দ দেখানোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
