রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই দুই দেশ পরস্পরের ওপর হামলা জোরদার করেছে। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, মস্কোর দিকে ৬৩০টি ড্রোন পাঠানোর দাবি করেছে রাশিয়া। হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের আলোচনা আবার শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া তিন দফায় অন্তত ২১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে তিনটিতে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এসব অস্ত্র বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বেসামরিক মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ১২টি অঞ্চলে হামলায় দুইজন নিহত এবং ৩৪ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচটি শিশু রয়েছে। তবে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা কয়েকটি এলাকায় আরও বেশি হতাহতের তথ্য জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার দাবি, রাতভর মস্কোর দিকে ৬৩০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন পাঠানো হয়েছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, ড্রোন হামলায় রাজধানীর কাছাকাছি দুইজন আহত হয়েছেন। বেশির ভাগ ড্রোন দূরবর্তী এলাকাতেই ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আগামী মাসে আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা আবার শুরু করতে রাশিয়া প্রস্তুত। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রুশ টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। পুতিনের মতে, যুদ্ধের অবসানের পর রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
জেলেনস্কিও আশা প্রকাশ করেছেন, ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের আলোচনা নভেম্বরের শুরুতে হতে পারে। তবে আগের আলোচনাগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। রাশিয়ার শর্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনকে আরও ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে, সামরিক বাহিনীর আকার সীমিত করতে হবে এবং সামরিক জোটে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কিয়েভ এসব শর্তকে আত্মসমর্পণের দাবি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ক্রেমলিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উইটকফের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক সংক্ষিপ্ত ছিল এবং এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার জন্য পুতিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ইউক্রেনে স্টারলিংক সেবা নিয়ে অনিশ্চয়তা
এদিকে, ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘মূল কথা হলো—তিনি এটি আবার চালু করেছেন।’
তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেনে স্টারলিংকের গতি এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রও জানিয়েছে, সেবাটিতে আরোপিত বিধিনিষেধের বেশির ভাগই বহাল রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এ সেবায় সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কেও সম্প্রতি টানাপোড়েন বেড়েছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, কিয়েভের অভিযোগ, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতাসংক্রান্ত তথ্য এবং ইউরোপের কেনা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নীতি পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন।
এদিকে ইউক্রেনের ওদেসা অঞ্চলের বন্দর অবকাঠামো ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত জাহাজে বড় ধরনের হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ হামলায় হতাহতের পাশাপাশি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের ময়দানে সংঘাত অব্যাহত থাকলেও কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সামরিক জোট নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের বড় ব্যবধানের কারণে নতুন আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
