নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফতুল্লার বিলাশনগরে একসঙ্গে ৩০টি ঝুটের গোডাউনে আগুন লাগার ঘটনা নতুন করে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর আগের রাতে জেলার পৃথক কয়েকটি স্থানে গ্যাস বিস্ফোরণ ও রাসায়নিক দুর্ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আগুন লাগার কারণ, গুদামগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ নারায়ণগঞ্জে কারখানার পাশাপাশি ঝুটের গুদাম, রাসায়নিক সংরক্ষণাগার ও আবাসিক ভবনের গ্যাসলাইনেও নিরাপত্তার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। কারণ, এসব স্থানে অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
৩০টি গোডাউনে আগুন : ফতুল্লার বিলাশনগর এলাকায় রোববার, ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত প্রায় দুইটার দিকে ঝুটের গোডাউনগুলোতে আগুন লাগে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, প্রতিটি গোডাউনে আনুমানিক ৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ঝুটের কাপড় মজুত ছিল। ৩০টি গোডাউনে বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে গেছে। এতে কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এসব গোডাউন পরিচালনা করতেন। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, আগুনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডলপাড়া, হাজীগঞ্জ ও শিবু মার্কেট ফায়ার স্টেশনের ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। পোশাক কারখানার ঝুটে সাধারণত কাপড়ের টুকরা, সুতা ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ থাকে। এসব উপকরণ ঘনভাবে স্তূপ করে রাখা হলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। গুদামগুলো পাশাপাশি অবস্থিত হলে একটি স্থাপনার আগুন অন্য স্থাপনাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বিলাশনগরের গোডাউনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার কী ধরনের ঘাটতি ছিল, তা তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না। এসব স্থাপনার ফায়ার লাইসেন্স, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি নির্গমনপথ ও ভবন ব্যবহারের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
গ্যাস বিস্ফোরণ ও রাসায়নিক দুর্ঘটনা : এর আগের রাতে নারায়ণগঞ্জের পৃথক কয়েকটি স্থানে গ্যাস বিস্ফোরণ ও রাসায়নিক দুর্ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাঁচপুরসহ কয়েকটি স্থানে গ্যাস বিস্ফোরণ এবং শিল্পাঞ্চলের রাসায়নিক গুদামে আগুনের ঘটনা ঘটে। দগ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়।
গ্যাসের লিকেজ থেকে ঘরের ভেতরে দাহ্য গ্যাস জমে গেলে সামান্য স্ফুলিঙ্গেও আগুন বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ, পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বদ্ধ স্থানে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ জানতে কারিগরি তদন্ত প্রয়োজন।
রাসায়নিক গুদামের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও জটিল। সেখানে কী ধরনের রাসায়নিক রাখা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং আগুন লাগলে কোন পদ্ধতিতে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা জরুরি। সব ধরনের রাসায়নিক আগুন একই পদ্ধতিতে নেভানো যায় না।
নজরদারির আওতায় কতটি গুদাম : নারায়ণগঞ্জে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের বিস্তারের সঙ্গে ঝুট সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার ও সংরক্ষণের ব্যবসাও গড়ে উঠেছে। এসব গুদামের মধ্যে কতটির বৈধ অনুমোদন রয়েছে, কতটি নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আসে এবং কতটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কার্যকর—তার হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিসের কাজ শুধু দুর্ঘটনার পর আগুন নেভানো নয়; ঝুঁকি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া এবং আইন অনুযায়ী পরিদর্শন ও ব্যবস্থা গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানেরও নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে।
তবে বিলাশনগরের গোডাউনগুলো আগে পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, কোনো অনিয়ম শনাক্ত হয়েছিল কি না কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি ও বক্তব্য পাওয়া ছাড়া অবহেলার অভিযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন : ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে প্রথমেই ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম ও রাসায়নিক সংরক্ষণাগারের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এরপর লাইসেন্স, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ এবং দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণের নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
ঝুটের গুদামে দাহ্য উপকরণ নিরাপদভাবে রাখা, গুদামের মধ্যে চলাচলের জায়গা খোলা রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। রাসায়নিক সংরক্ষণাগারে পদার্থের ধরন অনুযায়ী নিরাপদ সংরক্ষণ, সতর্কতামূলক চিহ্ন ও উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক ভবনে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন জ্বালানো বা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু না করে নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তের ফলাফল প্রকাশ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো তাই শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বিলাশনগরের ৩০টি গোডাউনের অগ্নিকাণ্ডের কারণ, আগের রাতের দুর্ঘটনাগুলোর তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই বোঝা সম্ভব হবে—শিল্পাঞ্চলে অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং তা দূর করতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
