‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ...।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ঘোষণার পরদিনই গুলিতে নিহত হন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।
মাদক, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ সীমান্ত এলাকার নানা অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধান করতেন আলিফ। মৃত্যুর আগে তার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এখন সামনে আনছে একাধিক প্রশ্ন।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগ, মাদক সরবরাহের পুরোনো মামলা এবং সীমান্ত এলাকার অপরাধের সঙ্গে তার হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি।
মৃত্যুর আগেও থামেননি আলিফ
সাংবাদিক আলিফ ফকিরের পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য, অপরাধসংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে এর আগেও তার ওপর হামলা হয়েছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকার মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ। কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ করতেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্রগুলো। এসব অনুসন্ধানে তিনি কতটা ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন, তা তার ওপর আগের হামলার ঘটনাগুলো নতুন করে সামনে এনেছে।
হত্যার আগে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে তার ফেসবুক পেজে অপরাধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল। তার সহকর্মীদের মতে, ওই পোস্টের সূত্র ধরে তিনি কোন অপরাধের তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন, তা বের করা জরুরি। এক্ষেত্রে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, কললিস্ট, সংরক্ষিত নথি ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ
আলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নথিপত্র যাচাইয়ে কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে।
এর আগে, একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
আলিফের মৃত্যুর আগে তার ফেসবুক পেজে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্যসংক্রান্ত অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও তিনি পোস্ট করেছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র শুধু ভোট দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় না। ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণেও এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে কোনো বিদেশি নাগরিক ভুয়া বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি পেলে তার প্রভাব পরিচয় জালিয়াতির বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। এ কারণে কলমাকান্দার অভিযোগের তদন্তে শুধু আবেদনকারী নয়, নথি তৈরির প্রতিটি ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু শুটার নয়, খুঁজতে হবে নির্দেশদাতাকে
আলিফ হত্যার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের হামলাকারী গ্রেফতার হলেও তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শুটার শনাক্ত করা নয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, তাৎক্ষণিক সংঘর্ষও নয়। ঘটনাটিকে পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং বলছে পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
আলিফের সহকর্মীরা বলছেন, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে হত্যা করতে হলে শুধু একজন শুটারই যথেষ্ট নয়; পরিকল্পনা, তথ্য, অর্থ ও নিরাপদ পালানোর ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।
একদিকে আলিফ হত্যার আগে মাদক, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ নিয়ে তার অনুসন্ধানের বিষয়টি তার পেজে ঘোষণাও দেওয়া ছিল। অন্যদিকে একই অঞ্চলে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার করার অভিযোগটিও ছিল হত্যার মাত্র দুই ঘণ্টা আগের স্ট্যাটাস।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েক বছর আগের একটি মাদক মামলায় ইলিয়াস কাদের বাবুল ও তার রোহিঙ্গা স্ত্রীর গ্রেফতারের তথ্য।
বিজ্ঞাপন
নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের নাম সামনে এসেছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে বাবুল, তার রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকব্যবসার সুবিধার জন্য বাবুল রোহিঙ্গা নারীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলে অভিযোগ ছিল।
বিজ্ঞাপন
বাবুলকে ঘিরে বর্তমানে যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদকব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
উত্তর খুঁজছে পরিবার, অপেক্ষায় সহকর্মীরা
আলিফের মৃত্যুতে তার পরিবার দুটি ছোট সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
সহকর্মীরা বলছেন, এখন তদন্তের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আলিফ হত্যার আগে ঠিক কোন তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন, তার অনুসন্ধানের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, আগের হামলাগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না এবং রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ, মাদক সরবরাহ ও সীমান্ত অপরাধের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায় কি না।
তাদের দাবি, এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আলিফের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন, নোট, যোগাযোগের তথ্য এবং শেষ কয়েক দিনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
গ্রেফতার আসামির একদিনের রিমান্ড
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুর্গাপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম।
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে গুলিতে নিহত হন আলিফ। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ গত শনিবার দিনগত রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। তিনি পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্গাপুরে পুলিশের উপ-পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
কেএএইচ/কেএইচকে/এএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
