ভারতের অনলাইনভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। বড় ধরনের বিক্ষোভ ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের তৎপরতার মধ্যে আটক থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তারা এ ঘোষণা দেন।
নয়াদিল্লি থেকে এএফপি জানায়, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধীদের আন্দোলন চলছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এ সংশোধনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দল লাভবান হতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ ভারতের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশন অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং আরও দুই নেতাকে গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) মুক্তি দেওয়া হয়। বিক্ষোভে অংশ নিতে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আগের দিন তাদের আটক করা হয়েছিল।
তরুণদের নেতৃত্বাধীন এ আন্দোলনকারী গোষ্ঠী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার থেকে হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছিল। আটকাবস্থা থেকে মুক্তির পর দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেন, ‘আমরা পিছু হটব না। আমরা জনগণকে বাইরে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন সৌরভ দাস।
গতকাল রোববার রাজধানীতে ছোট ছোট সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। এএফপির সাংবাদিকেরা এসব সমাবেশে পুলিশকে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করতে দেখেছেন। অবশ্য আটকের বিষয়ে পুলিশ কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে জুলাই মাসে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে সিজেপির আয়োজিত বিক্ষোভের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। মোদির সরকারের বিরল নতি স্বীকারের ঘটনা ছিল এটি।
উপস্থিত থাকা গুরুত্বপূর্ণ
শনিবারের সমাবেশের আগে কর্তৃপক্ষ রাজধানীজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালায়। এ সময় মেট্রোর কয়েকটি স্টেশন ও ২০০টির বেশি ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয় এবং কয়েকটি এলাকায় জনসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
রোববারও দিল্লিজুড়ে হাজারো পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন। তবে মেট্রো স্টেশনগুলো আবার খুলে দেওয়া হয় এবং আগে সীমিত করা মোবাইল পরিষেবাও পুনরায় চালু করা হয়।
এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, সাধারণত বিক্ষোভের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত যন্তর মন্তর এলাকায় প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর কাছাকাছি তিনটি স্থানে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করতে দেখা গেছে।
৩৭ বছর বয়সী আরতি নামের এক নারী বলেন, ‘গতকাল আমাকে ১০ ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল। আজ আবার এসেছি, কারণ উপস্থিত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।’
সিজেপির প্রধান আইনজীবী রত্না সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, এক বছর ‘শান্তি বজায় রাখার’ শর্তে আন্দোলনের নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
আটক এবং অন্যান্য নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দায়ের করা আবেদনের শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রোববার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন, শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া বিক্ষোভকারীদের যেন বেআইনিভাবে আটক করা না হয়।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি মৌখিক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরই কেবল আটক করা যাবে।’
শনিবার যন্তর মন্তর এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইলফোন পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার পর আদালত ইন্টারনেট সংযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটানো নিশ্চিত করতেও কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
মুক্তি পাওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপির দিপকে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আক্রমণ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের জন্য বিব্রতকর। এই দেশ কখনো এর চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরিকারী কাউকে দেখেনি।’
তরুণদের নেতৃত্বাধীন এ আন্দোলন ক্ষমতায় মোদির তৃতীয় মেয়াদে তাঁর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল হিসেবে গত মে মাসে যাত্রা শুরুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটি লাখ লাখ অনুসারী অর্জন করেছে।
গণবিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে ১৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম নির্বাচনি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এ সংশোধনের ফলে সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে মুসলিমরা, অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এতে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সম্ভাব্যভাবে লাভবান হতে পারে।
নির্বাচন কর্তৃপক্ষ বলছে, ভোটার তালিকা থেকে একই ব্যক্তির একাধিক নাম, মৃত ব্যক্তিদের নাম এবং জাল এন্ট্রি বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই এ সংশোধন করা হয়েছে।
শনিবার বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় তীব্র সমালোচনা হয়। মোদির সরকার ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর দিল্লিতে ‘ইচ্ছামতো আটক’ করা সবাইকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিরোধী কংগ্রেস দলের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ‘প্রত্যেক মানুষকে’ সঙ্গে নিয়ে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রা করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। এই কাপুরুষেরা আমাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না।’
