Ei Samay
Published on
:
5 min read
‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে’। এই দিয়েই যেন শুরু হয় আগমনী গানের পথ চলা। এই সুরের, ভাবের সঙ্গে দুর্গা দুর্গতিনাশিনী রূপের কোনও মিল নেই। উমা কোনও বিপদ আপদ দূর করতে, শত্রু সংহার করতে আসছেন না। আসছেন স্রেফ বাপের বাড়ি ক’দিনের ছুটি কাটাতে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনীর মহিষাসুর বধে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশের কোনও ভূমিকাই নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া/দেখা প্রাচীন দুর্গা মূর্তির সঙ্গে তাঁর পুত্র কন্যাদের দেখাও পাওয়া যায় না। কিন্তু বাঙালির উমা তো পুত্রকন্যাদের বাদ দিয়ে বাপের বাড়ি আসতে পারেন না। সুতরাং লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশেরাও তাঁদের ঝোলাঝুলি গুছিয়ে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। আমাদের বাংলার কবি রামায়ণের অকালবোধনের রণাঙ্গনের ছবির ক্যানভাসে দুর্গা দুর্গতিনাশিনীকে জলরঙের নিবিড় তুলির টানে এক গ্রামের বধূর পিতৃগৃহে আগমনে পরিণত করেছেন। অধিকাংশ বাঙালিই সেই আগমনের প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু সব উমা কি সত্যিই ঘরে ফিরতে পারেন?
মহালয়া পার হয়ে দেবীপক্ষ তো চলেই এসেছে, দেবী দুর্গার ঘরে ফেরার আর কয়েকটা দিন মাত্র দেরি। যদিও শাস্ত্রে বলেছে পথি নারী বিবর্জিতা, কিন্তু সে দেশেও মা দুর্গা চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোনও পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই বাপের বাড়ি চলে আসেন, যে বাপের বাড়িতে দুর্গাকে সাত বছর যেতে দেননি শিবঠাকুর, বলেন বাংলার কবি। কি না, বিবাহবাসরে বাঘছাল-পরা জামাই দেখে হাসি আটকাতে পারেননি মা মেনকা। আসলে শিবে-দুগ্গায় বাঙালির ভাবনায় পুরাণ-লোককথা-মঙ্গলকাব্য সব মিলেমিশে একাকার। তাই যিনি বিশ্বজননী, তাঁকেও বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়!
সে যাক গে! ভারতের দশজনে আটজন মেয়ে দেশান্তরী হন বিয়ের সুবাদে, সামান্য সংখ্যক মেয়ে কাজ বা পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে থাকেন। সে তো জলপাইগুড়ির মেয়ে কাজের জন্য চেন্নাই পাড়ি দিলে বা আসানসোলের মেয়ে সিঙ্গাপুরে পড়তে গেলে তাঁরাও দেশান্তরী। ভারতের জনগণনার হিসেব খুব পরিষ্কার। কোনও মানুষ যে জায়গায় জন্মেছে, সেই জায়গাতেই যদি জনগণনার হিসেবের সময়ে উপস্থিত না থাকে, তা হলেই সে দেশান্তরী। কারণগুলো ভিন্ন হতে পারে, পরিবার চলে গেছে বলে সে হয়তো বা পরিবারের সঙ্গে গেছে, নয়তো গেছে কাজের সুবাদে, যদিও বেশির ভাগই গেছে বিয়ের সুবাদে। এ ছাড়াও ছোটখাটো অন্য দু’একটা কারণ থাকতে পারে।
দেশান্তরী বিবাহিত মেয়েরা কে কে শরতের সুন্দর আবহে, ‘পুজোর সময়ে’, মা দুর্গার সঙ্গেই দেশে ফিরতে পারে? দুর্গা পুজো না হয় বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য, কিন্তু সারা ভারত জুড়েই তো এই সময়টায় নবরাত্রি পালিত হয়, নানা ধরনের নামে, নানা চেহারায়। যে বিবাহিত মেয়েরা চায়, তারা কি চাইলেই এই সময়ে ‘মায়ের রন্ধনে খাব ভাত’ বলে নিজের সংসার, নিজের অর্থকরী কাজের জায়গা ফেলে বাপের বাড়ি এসে বিশ্রাম নিতে পারে?
কাছে-দূরে
সেই ১৯৮৩ সালে দুই সায়েব, টিম ডাইসন আর মাইক মুর তাঁদের এক বিখ্যাত গবেষণায় সারা ভারতটাকে বিন্ধ্য পর্বত বরাবর একটু তেরছা করে আড়াআড়ি ভাগ করে বললেন, এর উত্তর-পশ্চিম দিকটায়, গুজরাট, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল— এ সব জায়গায় মেয়েদের বিয়ে হয় বাপের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, যাতে তারা বিপদে পড়লেও কোনও ভাবেই বাপের বাড়ির সাহায্য নিতে না পারে। বাপের বাড়ির লোকেরা খুব কম যোগাযোগ রাখে, বাপের বাড়ির কোনও আত্মীয় এসে শ্বশুরবাড়িতে রাত কাটায় না। এ সমস্ত জায়গায় স্বামী–স্ত্রীর বয়সের অনেক ফারাক। মেয়েদের সন্তান সংখ্যা অনেক বেশি, ফলে শিশুমৃত্যুর হার বেশি, নারী-পুরুষ অনুপাত বেশ কম। মেয়েদের বাইরে কাজ করার অনুপাতও কম। উত্তর ভারতে ওই যে ঋতুমতী হওয়ার পর ‘গওনা’ বা দ্বিতীয় বিবাহের পর মেয়ে স্বামী সহবাসে থাকতে চলল, আর মেয়ের বাপের বাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকবে না। দূরে হওয়ায় মেয়েরা বাপের বাড়ি যেতে চাইতেও পারে না। এককথায় মেয়েদের স্বাতন্ত্র্য বেশ কম। অনেকে আবার বলেছেন, যেখানে মেয়েদের সংখ্যা কম, সেখানে দূর থেকে বিয়ে করে নিয়ে আসা হয়। অন্য কেউ বলেছেন, যে সব জায়গা খরাপ্রবণ, সেখানকার পরিবার দূরে, সুজলা সুফলা গ্রামে মেয়ের বিয়ে দেয় যাতে কখনও মেয়ের খাবারের অভাব না ঘটে।
অন্য দিকে, দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে, যেমন কর্নাটক, কেরালা, তামিলনাডু, এ সব জায়গায় বিয়ে হয় বাপের বাড়ির কাছাকাছি, সারা জীবন আত্মীয়-স্বজনরা যোগাযোগ রাখে। কোনও কোনও জায়গায় তো এমনকি নিকট আত্মীয়ের সঙ্গেও মেয়ের বিয়ে হয়। মেয়ের বাপের বাড়ির সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ থাকে। সে মেয়ে যদি অন্য কোনও জায়গায় চলেও যায়, তার গোষ্ঠীর মানুষজনের সঙ্গে সহজেই সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
অলকা বসু, বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ, সমীক্ষায় দেখেছিলেন যে, দিল্লির বস্তিগুলিতে উত্তর ভারতীয় মেয়েদের তুলনায় দক্ষিণী মেয়েদের মধ্যে একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ানোর উদাহরণ অনেক বেশি। হয়তো বা দিল্লির অপরিচিত আবহাওয়ায় সেই পাশে-দাঁড়ানো আরও জোরদার ভাবে কার্যকর হতো। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে মেয়েরা অনেক সহজে বাপের বাড়ি বা আত্মীয়দের বাড়ি যেতে পারে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেশি, সন্তান সংখ্যা কম, বাইরে অর্থকরী কাজে যোগ দেওয়ার হার বেশি, আর মাতৃমৃত্যু বা শিশুমৃত্যুর হারও কম।
পরবর্তী সময়ে অন্যান্য গবেষকরা অবশ্য এই বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, দক্ষিণ বা উত্তরের রাজ্যে এই যে প্রথাগুলো চলত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও বদলাচ্ছে। দক্ষিণেও মেয়েদের গ্রামের বাইরে, দূরে বিয়ে হচ্ছে। আর্থিক নীতি কী ভাবে রূপায়িত হচ্ছে, পরিকাঠামো, যেমন স্কুল বা রাস্তার আলো, এ সবের কী ব্যবস্থা হচ্ছে, মেয়েদের পারিশ্রমিক কেমন, সেই সব বিষয় মেয়েদের স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তি হিসাবে অনেক বেশি উঠে আসছে, উত্তর বা দক্ষিণের আত্মীয়তার ধরন নয়।
মা দুর্গা কোথাকার মেয়ে
মা দুর্গার বাবা হিমালয়। তিনি সমতলে, তথাকথিত বাপের বাড়িতে চার দিন কাটিয়ে আবার হিমালয়ে শিবের ঘরেই চলে যান। তা হলে তো ভৌগোলিক ভাবে তিনি হয় উত্তর ভারত, নয়তো পূর্ব ভারতের মেয়ে। পূর্ব ভারত হলে তাঁর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে একলা সমতলে আসার সেই সুযোগ রয়েছে, কারণ ওই ডাইসন-মুর-এর বিভাজন তত্ত্ব পূর্ব ভারতে মেয়েদের সিদ্ধান্তের স্বাতন্ত্র্য আছে, এমন বলেছে।
কিন্তু উত্তর ভারত হলে? একলা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দেওয়া তো দূরের কথা, কেউ দিয়ে না এলে বা বাপের বাড়ি থেকে কেউ নিতে না এলে তাদের বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোই হয় না। আজও বহু বাড়িতে মেয়েরা একলা বেরোতে পারে না। উত্তর ভারতে তো নয়ই, এমনকি মা দুর্গার নিজের বাপের বাড়ির দেশেও নয়। তবু এই স্বতন্ত্র মেয়ের, স্বতন্ত্র মায়ের ছবিটা আঁকা হয়। অনেকে অবশ্য চালচিত্রের উপরে ছোট করে শিবঠাকুরের ছবি এঁকে দেয়, তিনি নজর রাখছেন স্ত্রীর উপরে।
যে মায়েরা ফিরতে পারেন না
এমন অনেক মেয়ে পরিবারের ভরণপোষণের জন্যই এমন কাজ নিতে বাধ্য হয়, যে কাজে কোনও ছুটি নেই। হয়তো কোনও অসুস্থ মানুষকে দেখাশোনা, যাকে দেখার আর কেউ নেই। যারা বিদেশে-বিভুঁইয়ে কাজ নিয়ে গেছে, বাড়ি থেকে অনেক অনেক দূরে, তারা পুজোতে ছুটি মোটেই পাবে না। এই সময়ে টিকিট পাবে না। ভোটের সময়ে এই মানুষরাই দু’দিনের জন্য ভোট দিতে দেশে ফেরে হয়তো, কিন্তু সে তো প্রাণের দায়! কারও হয়তো দুবাইতে হোটেলে হাউসকিপিং, কারও চেন্নাইতে বাঙালিরা যায় এমন হাসপাতালের কাছাকাছি হোটেলে রান্না দেখাশোনার কাজ। তাদের লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশদের দেখাশোনা করে আত্মীয়স্বজনরা, নয়তো আবাসিক কোনও ইস্কুলে, যদিও নাম লেখানো থাকে কোনও সরকার-পোষিত স্কুলেই। সেই মায়েদের জীবনে কোনও দিন মা দুর্গা হয়ে ওঠা হয় না, দুর্গা পুজোর সময়ে তো নয়ই। হ্যাঁ, তারাও তো বাড়ি আসে, তখন সবার জন্য সাধ্যমতো আনে অনেক জিনিস। বাচ্চারা মাকে একটু কাছে পায়। সবচেয়ে ছোটটা দূর থেকে আঙুল চুষতে চুষতে নতুন এই মানুষটাকে দেখে। তাকে কাছে টেনে একটু বেশি আদর করে অপরিচয়ের গণ্ডিটা ভাঙা। সবাই মিলে একটু বেশি করে মাংস খাওয়া। বাড়ির ছাদটা সারাই।
তবু এই পুজো এলে, আগমনী গান বেজে উঠলে উমাদের বাড়ি ফেরার কথাটা আবার শিউলি ফুলের সুবাসের মতো বাতাসে ভেসে আসে। মেয়েদের দেশান্তরী হওয়াটা, বিশেষত বিবাহসূত্রে, প্রায় সব সমাজেই আছে। এই বিচ্ছিন্নতা এতটাই হতো যে, রেলের কামরায় আসনে বসা নিয়ে দুই নারীর কলহের শেষ পর্যায়ে তারা আবিষ্কার করে যে, তারা আসলে দুই সহোদরা, শৈশবের স্মৃতি ছোটজনের মনে নেই। বড়টির যখন বিয়ে হয়ে যায়, ছোটটি এতই ছোট ছিল যে আজ দিদিটি তাকে চিনতেই পারছে না। বিয়ের প্রায় দু’দশক পর তাদের সাক্ষাৎ এবং দু’জনেই পুজোয় বাপের বাড়ি যাচ্ছে। এখন মোবাইলের যুগে সে অবস্থা না থাকলেও অনেক দুর্গাই ইচ্ছে হলেও পিতৃগৃহে আসতে পারেন না। তবু এই আগমনী গান, পুত্রকন্যা-সহ দুর্গা প্রতিমা, বারবার মনে করিয়ে দেবে উমাদের বাড়ি ফেরার কথা। অর্থনীতি সমাজতত্ত্বের কোলাহলের বাইরে এসে বাঙালি কবির আগমনী গান উমাদের আকাঙ্ক্ষাকে চিরজীবী করে রাখবে।
লেখক অর্থনীতির শিক্ষক ও সমাজকর্মী