সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রতিবেদন
জালালাবাদ ডেস্ক : দেশে অপরাধের সামগ্রিক চিত্রে স্বস্তি ও উদ্বেগ-দুই প্রবণতাই স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও অপহরণের ঘটনা কমেছে। বিপরীতে ধর্ষণ, সিঁধেল চুরি, সাধারণ চুরি এবং মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ১ হাজার ২৭১টি, আর মাদক মামলা বেড়েছে ১৪ হাজারের বেশি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৯০টি।
জাতীয় সংসদ ভবনে স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। উপস্থাপিত তথ্যে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯১৩। অর্থাৎ খুন কমেছে ২৫৪টি। ডাকাতির ঘটনা ৫৩৮টি থেকে কমে ৩৮৭টি, দস্যুতা ১ হাজার ৪৮৩টি থেকে কমে ১ হাজার ৩৭৪টি এবং অপহরণ ৮১২টি থেকে কমে ৭৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
দাঙ্গার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছর প্রথম নয় মাসে ৬২টি দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হলেও চলতি বছর হয়েছে মাত্র ১৭টি। বিস্ফোরকদ্রব্য-সংক্রান্ত ঘটনা ২৮৬টি থেকে কমে ১৮৮টি হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত বিচার আইনে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ৭৪৩টি থেকে কমে ৫৯৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
তবে এসব ক্ষেত্রে অপরাধ কমলেও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার চিত্র পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ধর্ষণের ঘটনায় ৫ হাজার ৩৮১টি মামলা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৪ হাজার ১১০টির তুলনায় ১ হাজার ২৭১টি বেশি। অন্যদিকে নারী নির্যাতনের মামলা ৯ হাজার ২৬২টি থেকে কমে ৮ হাজার ১৭৮টিতে নেমেছে। শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ৩ হাজার ৫৯১টি থেকে কমে ৩ হাজার ১৫১টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা চারটি থেকে বেড়ে পাঁচটি হয়েছে।
চুরির ঘটনাতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সিঁধেল চুরির মামলা ২ হাজার ২৫৫টি থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪৪৫টি হয়েছে। সাধারণ চুরির ঘটনা ৭ হাজার ২৭৩টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৪০টিতে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা। গত বছরের প্রথম নয় মাসে এ ধরনের মামলা ছিল ৩৯ হাজার ৫০টি। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৫৩ হাজার ৭২টিতে দাঁড়িয়েছে। এক বছরে বেড়েছে ১৪ হাজার ২২২টি মামলা। অপরদিকে গত বছর ৪৬৩ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হলেও চলতি বছর এ সংখ্যা কমে ৪৪১ জনে এসেছে।
তৃতীয় প্রান্তিকেও একই প্রবণতা:
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের পরিসংখ্যানেও অপরাধের একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের এ তিন মাসে দেশে ৫৫ হাজার ৪৫৪টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মামলা হয়েছিল ৪৬ হাজার ৪৭৯টি। অর্থাৎ তিন মাসে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৮ হাজার ৯৭৫টি।
এসময়ে খুনের ঘটনা ৯৮০টি থেকে কমে ৮৮১টিতে নেমেছে। তবে ধর্ষণের ঘটনা ১ হাজার ৩৭০টি থেকে বেড়ে ২ হাজার ১২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৩ হাজার ১২৫টি থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২৩৬টি হয়েছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলাও বেড়েছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে এ ধরনের মামলা ছিল ১৪ হাজার ১০৩টি, যা চলতি বছরের একই সময়ে বেড়ে ২০ হাজার ৬৫১টিতে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ১৩৩টি থেকে কমে ১২৩টিতে এসেছে। চুরির ঘটনা কিছুটা কমলেও সিঁধেল চুরি বেড়েছে।
মাদক, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে আলোচনা :
জাতীয় সংসদের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে গত বছর ও চলতি বছরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করেন কমিটির সদস্যরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র থাকায় সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে সারা দেশে মাদকের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে গৃহীত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মো. মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম (বুলবুল) ও মো. আব্দুল বাতেন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধান এবং সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
