ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে লঞ্চ চলাচলের রোটেশন প্রথার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। পর্যাপ্ত লঞ্চ থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন সব লঞ্চ চলাচল না করায় কেবিন ও ডেকে জায়গা পাওয়া নিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে। এ সুযোগে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কেবিন পেতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে ফোন করানোরও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন থেকে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বেতুয়া–ঢাকা নৌপথ। এ পথে একাধিক লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা থাকলেও রোটেশন পদ্ধতির কারণে প্রতিদিন সব লঞ্চ চলাচল করে না। অভিযোগ রয়েছে, লঞ্চমালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিদিন এক থেকে দুটি লঞ্চ পরিচালিত হওয়ায় যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় আসন ও কেবিনের সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে ছুটির দিন ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের সময় এ ভোগান্তি আরও বাড়ে।
যাত্রীদের অভিযোগ, কেবিন ও টিকিটের সংকটকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দাবি করেন। অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি না হলে কেবিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে।
যাত্রী মো. আলমাস বলেন, পূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে চরফ্যাশনে আসার সময় একটি সিঙ্গেল কেবিনের জন্য ২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। কেবিন পেতে একজন ভিআইপি ব্যক্তিকে দিয়ে ফোন করাতে হয়েছে। সাধারণভাবে কেবিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চরফ্যাশন চর মানিকা ইউনিয়নের বাসিন্দা চরফ্যাশন পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন মিয়া বলেন, এ এলাকা থেকে প্রতিদিন অনেক মুমূর্ষু রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যান। কিন্তু লঞ্চে কেবিন বা পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ সময় ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ডেকে গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়, যা অসুস্থ রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
জুবায়ের হোসেন জানান, সামনে শীত মৌসুম। এ সময় চরফ্যাশনের কুকরি-মুকরি ও তারুয়া সমুদ্রসৈকত দেখতে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ সময় লঞ্চমালিকেরা রোটেশন পদ্ধতিতে একটি বা দুটি লঞ্চ পরিচালনা করলে পর্যটকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে। তাই এ অঞ্চলের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে রোটেশন প্রথা বাতিল করে তিনটি লঞ্চ নিয়মিত চালুর দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, রোটেশন প্রথা বন্ধ করতে হলে বিআইডব্লিউটিএকে লঞ্চমালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় এ প্রথা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তবে এটিও সত্য, কোনো কোনো সময় এ নৌপথে যাত্রীর সংখ্যা অনেক কম থাকে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, রোটেশন প্রথার কারণে যাত্রীসেবার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। জনস্বার্থের পরিবর্তে মালিকপক্ষের বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণেই সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, রোটেশন প্রথা বন্ধ ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার দাবিতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। যাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে মাঝেমধ্যে এ পদ্ধতি বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পর আবার চালু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে রুট পারমিটধারী লঞ্চগুলোর নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করা, কেবিন বুকিংয়ে স্বচ্ছতা আনা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
যাত্রীদের মতে, কেবিন বুকিংয়ে ডিজিটাল বা অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসন হবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।
ভোলার চরফ্যাশন বেতুয়া নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক পুতুল চন্দ্র রায় জানান, চরফ্যাশন-ঢাকা নৌপথে তাসরিফ, কর্ণফুলী ও টিপু কোম্পানির লঞ্চ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। তবে যাত্রীসংকটের অজুহাতে লঞ্চমালিকেরা রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিদিন দুটি, আবার কখনো একটি লঞ্চ পরিচালনা করছেন। এতে এ নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে বড় কোনো উৎসবের সময় তিনটি লঞ্চই চলাচল করে।
