চা-বাগান ও সবুজ পাহাড়ঘেরা দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজার। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই জেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পর্যটন জেলা’ হিসেবে ঘোষণা করার দীর্ঘ দেড় যুগ বা ১৮ বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত এখানে কোনো দৃশ্যমান ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। পর্যটন সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বেসরকারি খাতে বেশ কিছু আধুনিক হোটেল, মোটেল ও বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে উঠলেও সরকারিভাবে বড় ধরনের কোনো মাস্টারপ্ল্যান (উন্নয়ন উদ্যোগ) নেওয়া হয়নি। ফলে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি উদাসীনতায় অবহেলিতই রয়ে গেছে এ অঞ্চলের পর্যটনশিল্প। একই সঙ্গে জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মাঝে মাঝে বখাটেদের উৎপাত ও নিরাপত্তার সংকট নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
জানা যায়, দেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এই জেলায় শতাধিক কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ৯২টি চা-বাগান, সবুজ পাহাড়, হাকালুকি হাওর, জলপ্রপাত এবং নানা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, যা খুব সহজেই পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। ২০০৮ সালে তৎকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণা করে। তবে দীর্ঘ এই সময়ে সরকারি নজরদারির অভাবে জেলার যাতায়াতব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন থমকে রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি মানসম্মত মোটেলও আজ পর্যন্ত এই জেলায় স্থাপিত হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে এই জেলার প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটনশিল্পের ওপর ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে যোগাযোগের দুর্বল কাঠামোর কারণে পর্যটন খাত থেকে কাক্সিক্ষত রাজস্ব পাচ্ছে না রাষ্ট্র। জেলাজুড়ে সড়কপথ ও রেলপথের বেহাল দশা, ট্রেনের টিকিটের তীব্র সংকট, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহনের অভাব এবং শ্রীমঙ্গল বা জেলা শহর ছাড়া ভালো মানের খাবারের হোটেলের অপ্রতুলতা পর্যটকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। বিশেষ করে বিমান ও উন্নত পরিবহন সুবিধা না থাকায় বিদেশি পর্যটকেরা এই অঞ্চলে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক জারা রহমান জানান, এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ চমৎকার হলেও সার্বিক যোগাযোগ ও যাতায়াতব্যবস্থা খুবই বাজে। পর্যটকদের জন্য কোনো বিশেষ বাস বা আঞ্চলিক পরিবহন নেই। এ ছাড়া নারী পর্যটকেরা একা বা দুজন মিলে ঘুরতে এলে স্থানীয় কিছু বখাটের উৎপাতে পড়তে হয়, যা পর্যটন পরিবেশকে ক্ষুণœ করছে।
আবিদ হাসান জানান, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার জেলা শহর ছাড়া আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এলে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয় নিরাপত্তা নিয়ে। এ ছাড়া যাতায়াতে পর্যটকদের জন্য বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা নেই। সরকারি উদ্যোগে পরিবহনব্যবস্থা সহজ করা হলে পর্যটকেরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারতেন।
শ্রীমঙ্গলের পর্যটন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় রিসোর্ট পরিচালকদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগে শুধু রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও সরকারি উদ্যোগে নতুন কোনো দর্শনীয় স্থান তৈরি হয়নি। শ্রীমঙ্গল পর্যটনসেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ জানান, যাতায়াতব্যবস্থার নাজুক দশা এবং প্রচার-প্রচারণার অভাবে বছরের নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে পর্যটকদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। সরকারিভাবে অবকাঠামো আধুনিকায়ন, সড়ক সংস্কার ও উন্নতসেবা নিশ্চিত করা গেলে এই খাতে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যটন পুলিশ জানায়, পর্যটনকেন্দ্রে বখাটেদের উৎপাতের খবর পেলে তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা অনেকটাই কম। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেনের মতে, জেলায় একটি মিউজিয়াম ও শিশু পার্ক স্থাপনসহ বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে প্রতিটি দাবি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব পর্যটনের উন্নয়নে ততটুকু কাজ করা হচ্ছে।
