একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে থামেনি ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন; বরং এবার তা পৌঁছেছে গণতন্ত্রের আরও স্পর্শকাতর প্রশ্নে— ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা।
রাশেদুল হাসান
একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে থামেনি ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন; বরং এবার তা পৌঁছেছে গণতন্ত্রের আরও স্পর্শকাতর প্রশ্নে— ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা। ১০ অক্টোবর দিলীøর যন্তর মন্তরে নির্ধারিত সমাবেশের আগেই ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেসহ আন্দোলনের নেতাদের উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আটক করেছে পুলিশ। আটক হয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও আইসার কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরাও।
বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক ধরপাকড়, নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্ন তুলছে—ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের জবাব কি স্বচ্ছতা দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি প্রতিবাদ দমনের মাধ্যমে?
এর আগেও দিলীøর অন্ধ্র ভবনের সামনে থেকে পুলিশ নেহা বোরাকে আটক করে। তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) কেন্দ্রীয় সভাপতি। এটি ভারতের বামপন্থী দল সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন। আইসার অভিযোগ, গাড়িতে পুলিশ ছিল না, নারী কনস্টেবল ছিল না। বোরাকে ছাড়া হয় শহরের উত্তর প্রান্তে নারেলা থানা থেকে। তিন দিনে তৃতীয় দফা আটক— ২ অক্টোবর যন্তর মন্তরে প্রায় সাতশ জনের সঙ্গে, ৩ অক্টোবর প্রায় দেড়শ জনের সঙ্গে, ৪ অক্টোবর একা। ছাড়া পেয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওরা মনে করে আমরা কুকুর, তেলাপোকা। আমরা নাগরিক, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের আছে। এরপর ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি ‘গণ আদালত’ বসিয়েছে। বিচারকের আসনে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি গোপাল গৌড়া, সাংবাদিক বিজয়াম্মা এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলা ইব্রাহিম। মঞ্চে ছিলেন ধ্রুব রাঠী।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’, অর্থাৎ তেলাপোকার দল। নামটা শুনে হাসি পাওয়ারই কথা। অথচ এ তরুণদের আন্দোলনই গত জুলাইয়ে প্রথম দফায় আন্দোলনে নেমেই ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। নিবন্ধিত দল নয়, তহবিলের হিসাব নেই, রাজ্যে রাজ্যে কমিটিও নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া একটি সংগঠনের চাপে একজন মন্ত্রী সরতে বাধ্য হন। বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
নামের উৎসও লক্ষ করার মতো। মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি এক শুনানিতে বেকার তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন। পরদিনই অভিজিৎ দীপ নামে এক তরুণ সংগঠক সেই অপমানকেই দলের নাম বানিয়ে ফেলেন। অপমানকে পরিচয়ে বদলে দেওয়ার এই কৌশলই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে তরুণদের কাছে আপন করে তুলে। কিন্তু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগেই যে গল্প শেষ, তা নয়। দ্বিতীয় দফায়ও ককরোচ জনতা পার্টির দাবি একজন কর্মকর্তার পদত্যাগ, এবার নিশানায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এবারের আন্দোলনের প্রশ্নটাও বদলে গেছে— কে ভোট দিতে পারবেন, আর সেটা ঠিক করবেন কে? গণতন্ত্রের ভিত নড়ে ওঠে ঠিক এখানেই।
ছাত্র আন্দোলনের শক্তি দক্ষিণ এশিয়া নতুন করে চিনেছে, আর আমরা চিনেছি সবচেয়ে কাছ থেকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অনেক রক্তের বিনিময়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। গত বছর নেপালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ফেটে পড়ে, সরকারেরও পতন ঘটে।
ছাত্রদের শক্তি শুধু সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। দাবি সাধারণ মানুষের কতটা জীবনঘনিষ্ঠ, আন্দোলন কতটা সংগঠিত, বিভিন্ন শে্িরণ-পেশার মানুষ যোগ দিচ্ছেন কি না এবং রাষ্ট্র কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, এ চার প্রশ্নের উত্তরেই ঠিক হয়, আন্দোলন নিভে যাবে নাকি ক্ষমতার ভিত কাঁপাবে। সব আন্দোলন সরকার ফেলে না। দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেলে নি, কিন্তু ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনেছিল। ভারত কোন পথে যাবে, তা আগেভাগে বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ বা নেপালের পরিণতির দিকে দেশটি এগোচ্ছে, এমন প্রমাণ এখনো নেই। তবু যোগসূত্রটা অস্বীকার করা যায় না। ঢাকা, কাঠমান্ডু এবং এখন দিলীø, তিন রাজপথেই ক্ষোভের মূলে একই জিনিস: জবাবদিহিহীন ক্ষমতা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
শুরুটা হয়েছিল পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখী পদযাত্রায় পুলিশ লাঠিচার্জ করলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সংসদ অচল হওয়ার আশঙ্কা আর শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ-কর্মী সোনাম ওয়াংচুক-এর অনশন যোগ হয়ে চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান পদ ছাড়েন। এই পদত্যাগ আন্দোলনের জয়, আবার সরকারের কৌশলগত পিছু হটাও। মন্ত্রী মোদি সরকারেরই লোক। তাঁকে সরিয়ে সরকার নিজের একটি ব্যর্থতা মেনে নিয়েছে মাত্র।
এরপর আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। আগস্টে সংগঠকেরা জানান, তাঁরা নির্বাচনে লড়বেন না, চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবেই থাকবেন, যদিও সঙ্গে জুড়ে দেন ‘আপাতত’। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা নিয়ে তাঁরা মিছিলের ঘোষণা দিলে সরকার জানায়, সব মামলাই তুলে নেয়া হবে। রাস্তায় না নেমেই জয়। তারপর প্রায় তিন সপ্তাহ রাজপথ ফাঁকা, হাতে নতুন কোনো দাবি ছিল না।
সে শূন্যতা পূরণ করে ২৩ সেপ্টেম্বরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। তাতে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই কমিশনার দশ মাসে অন্তত ১৪ বার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্তে লিখিত আপত্তি দিয়েছেন। একটি আপত্তি ছিল ভোটারদের তথ্যভান্ডার রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত করা নিয়ে। আরেকটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে ১৬ লাখ ভোটারের বিরুদ্ধে আপিল নিয়ে। সেই আপিল কে অনুমোদন করেছেন, তা-ও তাঁরা জানতেন না।
এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন আন্দোলনকারীরা কুমারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। দাবি তিনটি: পদত্যাগ, ভোটার তালিকার সংশোধন বন্ধ এবং নিয়োগ আইন বাতিল। ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের সমাবেশ দিয়ে শুরু হয় সারা দেশে বিক্ষোভ। ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর গণ আদালতে নাম কাটা পড়া মানুষ নিজেদের কথা শোনান। এরপর দিল্লীতে ডাকা হয় আরও বড় সমাবেশ।
যন্তর মন্তরে সমাবেশ ঠেকাতে আটক করা হয়েছে— তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, নেহা বোরা, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, ককরোচের নেতা অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা ও রত্না সিংকে। এছাড়াও জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠি ও কাব্য কর্ণাটককে আটক করা হয়েছে। মুম্বাইয়ে আটক করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও ‘হাম ভারত কে লগ’ সংগঠনের সভাপতি তুষার গান্ধীকেও। সব মিলিয়ে দিলীøজুড়ে প্রায় ৪ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ।
সরকারের চাপের দিকটা বাস্তব। ২০২৫ সালের জুন থেকে ধাপে ধাপে চলা সংশোধনে খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের ১৩-১৪ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধীদের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২ শতাংশের মতো। কমিশন বলছে, বাদ পড়াদের বড় অংশ মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত ভোটার। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন।
বেঙ্গালুরুর একটি মহল্লায় ১ হাজার ৩০০ জনের মধ্যে ৮২৬ জনকে স্থানান্তরিত দেখানো হয়েছে, অথচ তাঁরা সেখানেই থাকেন। এদিকে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখা মানুষের হার ২০১৯ সালের ৫১ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৪ সালে হয়েছে ২৮ শতাংশ। এ আস্থার সংকটের মধ্যেই নতুন প্রজন্ম প্রথমবার ভোটার হচ্ছে। দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভের ব্যাপ্তিও কম নয়। একটি সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাবে, দশ দিনে সারা ভারতে প্রায় ৩০০ কর্মসূচি হয়েছে, যা আগের দেড় বছরের নথিভুক্ত প্রতিবাদের প্রায় অর্ধেক। বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ। দাবি আলাদা হলেও সবার ভেতরে একই প্রশ্ন: ক্ষমতাসীনেরা কার কাছে জবাবদিহি করেন? তবু সরকার শক্ত অবস্থানে। ক্ষমতাসীন দল লোকসভায় একাই ২৪০ আসনে, শরিকদের কেউ কুমারের পদত্যাগ চায়নি, আর পরের জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে। জুলাইয়ে সরকারকে নুইয়েছিল সংসদ অচল হওয়ার ভয়। এখন অধিবেশন বসছে না, তাই সময়ক্ষেপণের কৌশল নেওয়া তার পক্ষে সহজ। আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরানো মন্ত্রী সরানোর মতো নয়। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর অপসারণ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতোই কঠিন। সংসদের দুই কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে। মার্চে বিরোধীদের দেওয়া নোটিশ কোনো কারণ না দেখিয়েই খারিজ হয়েছে। ভোটে জেতার সংখ্যাও তাঁদের নেই। লোকসভায় অন্তত ৩৬২ জনের সমর্থন লাগে, বিরোধী জোটের আছে ১৮৪ জন।
সুপ্রিম কোর্টও সতর্ক। কুমারকে সাময়িক বরখাস্ত করতে রাজি না হয়ে আদালত প্রশ্ন তুলেছে, তাহলে নির্বাচন চালাবে কে? তবে কমিশনের তিন কর্তাকেই এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। আইনে কমিশনের সিদ্ধান্ত হয় সর্বসম্মতিতে বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে, প্রধান কমিশনের কোনো ভেটো নেই। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভার বাকি দুই কমিশনারের হাতেই। অথচ তাঁরা ভেতরের নোটে কুমারের বিরুদ্ধে আপত্তি লিখেছেন, আর কুমার তার সিদ্ধান্ত ঠিকই কার্যকর করেছেন। এখন আদালতের প্রশ্নে প্রকাশ্যে তাঁরা কী বলেন, সেটাই কুমারের প্রথম বড় পরীক্ষা।
বিজেপি সরকার যে কুমারকে সহজে ছাড়বে না, এর যুক্তিও আছে। কঠিন কাজগুলো বারবার এই আমলাকে দিয়েই উদ্ধার করেছে সরকার। তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ পরের জাতীয় নির্বাচনের ভোটার তালিকাও তাঁর অধীনেই তৈরি হচ্ছে। সংশোধিত তালিকায় ভোট হওয়া দুই রাজ্যেই বিজেপি জিতেছে। তাঁর পদত্যাগ তাই হয়ে দাঁড়াবে এক ধরনের স্বীকারোক্তি, যেন কমিশন আর সরকার মিলে মিশে একাকার। এতে জয়ের ভিত নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। মন্ত্রী ছাড়া আর এই পদ ছাড়ার দাম এক নয়।
আন্দোলনেরও দুর্বলতা স্পষ্ট। এর নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো নেই। রাজপথে মানুষ আনছে বামধারার ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো, যাদের রাজ্যে রাজ্যে কমিটি আছে, মিছিলের অভ্যাসও আছে। এই আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর সমর্থন যত বাড়ছে, ‘আমরা কোনো দলের নই’ কথাটা ধরে রাখা তত কঠিন হচ্ছে।
ইতিহাস এখানে দু’রকম শিক্ষা দেয়। ১৯৭৪ সালে বিহারের ছাত্রদের আন্দোলন বিরোধীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ক্ষমতা বদলে দিয়েছিল। আবার ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন রাজনীতিতে নামা নিয়ে ভেঙে গিয়ে নতুন একটি দলের জন্ম দিয়েছিল। এই আন্দোলনের পথ ঠিক হবে সংগঠন ও নেতৃত্ব গড়তে পারা না পারার ওপর। বিরোধী জোট নিজেও ভাঙনের মুখে, ফলে ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কাও অমূলক নয়। তবে মোদী সরকারের বয়ান বদলেছে। আগে শীর্ষ নেতারা ভোটার ছাঁটাইকে অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর কাজ বলতেন, এখন বলছেন আন্দোলনের পেছনে বিদেশী ষড়যন্ত্র। যুক্তি ফুরোলে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নিতে হয়, এটা আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ নয়। সরকার পতনের আসন্ন সংকট দেখা যাচ্ছে না, এ কথা ঠিক। কিন্তু প্রশ্নটি যে আর একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে আটকে নেই, তাও সমান সত্য।
ভোটার তালিকা শুদ্ধির এ বিতর্কে বাংলাদেশের নাম এসেছে বারবার, প্রায় সব সময় নেতিবাচক প্রসঙ্গে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একে অনুপ্রবেশকারী ঠেকানোর কাজ বলেছেন। অথচ নির্বাচন কমিশন কোনো দেশের নাম নেয়নি, আর বিহারে বিদেশী নাগরিকের কোনো সংখ্যাও প্রকাশ করে নি। এক অনুসন্ধানে চূড়ান্ত তালিকায় অযোগ্য পাওয়া গেছে মোট ভোটারের মাত্র ০.০১২ শতাংশ। বাংলাদেশকে ঘিরে তোলা বয়ানের তথ্যভিত্তি তাই দুর্বল।
তবু সে বয়ানের ফল পড়ছে আমাদের সীমান্তে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার প্রতিটি জেলায় হোল্ডিং সেন্টার খুলেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনকে ফেরত পাঠানোর দাবি করছে। বাংলাদেশের হিসাবে পুশ-ইন হয়েছে ২ হাজার ৪৭৯ জন, যাঁদের অন্তত ১২০ জনকে বিজিবি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে। দুই হিসাবের এই ফারাকই বলে দেয়, প্রক্রিয়াটি কতটা অস্বচ্ছ।
মুসলিম ভোটারদের নিয়ে অভিযোগ আরও গুরুতর। বেঙ্গালুরুর গণ আদালতে সাক্ষ্য এসেছে, দুটি উপজেলায় মুসলিম নামের ভোটারদের বিরুদ্ধেই নাম কাটার আবেদন জমা পড়েছিল। মুর্শিদাবাদের একটি ট্রাইব্যুনালে অযোগ্য ঘোষিতদের ৯৭ শতাংশের বেশি মুসলমান বলেও হিসাব মিলেছে। এসব অভিযোগ যাচাইসাপেক্ষ, সংশোধন ও আপিলের সুযোগও আছে। তবু একটি সম্প্রদায় অনুপাতের চেয়ে বেশি ভুগছে, এমন প্রশ্ন ওঠাই যথেষ্ট গুরুতর। ন্যায়বিচারের যে মূল্যবোধ আমাদের বিশ্বাসের ভিত, সেই আলোকে এ প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। তবে আমাদের অবস্থান হবে ন্যায়ের পক্ষে, বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। ভারতের বহু মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই লড়াইয়ে নেমেছেন।
ভারতের ক্ষমতাসীন দলের এক মুখপাত্র বিরোধীদেও চলমান এ কর্মসূচিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো নৈরাজ্য তৈরির চেষ্টা বলেছেন। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানকে ভীতির উদাহরণ বানানো মেনে নেওয়ার কারণ নেই। অথচ ভারতের তরুণেরা সরকার ফেলতে চাইছেন না। তাঁরা জানতে চান, পরের নির্বাচনে কে ভোট দিতে পারবেন এবং সেটা ঠিক করার এখতিয়ার কার।
ভারতের এ আন্দোলনে পলাতক হাসিনা ও তাঁর অনুসারীদের জন্য বার্তা রয়েছে। যাঁরা এখনো ভাবছেন, দিলীø তাঁদের ক্ষমতায় বা রাজনীতিতে ফেরার পথ করে দেবে, তাঁদের আরো ভাবতে হবে। যে সরকার নিজের দেশেই ভোটের বৈধতার প্রশ্নে কোণঠাসা, সে অন্য দেশে কাউকে ক্ষমতায় বসানোর ঝুঁকি কতটা নেবে? ভারতের সরকার দুর্বল, তা নয়। সে শক্ত, নির্বাচনও বহু দূরে। আগে তো ঘর সামলাতে হবে।
কথা হলো, বিদেশী পৃষ্ঠপোষকের ভরসায় দাঁড়ানো রাজনীতির আয়ু ওই পৃষ্ঠপোষকের স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। জনগণের সম্মতি ছাড়া বাইরের সমর্থনে ফেরানো ক্ষমতার জবাব বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালেই দিয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, গুম আর দমন-পীড়নের বিচার হবে জনগণ ও আইনের কাছে। দিল্লির কোনো সমীকরণ সেই হিসাব মুছতে পারে না।
বাংলাদেরও করণীয় আছে। পলাতক হাসিনার প্রত্যর্পণে আইনি ও কূটনৈতিক চাপ চালিয়ে যেতে হবে। পুশ-ইনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া দাবি করতে হবে, যাতে জোর করে কোনো ভারতীয়কে ঠেলে পাঠানো না হয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পক্ষ না নেওয়াই ‘পরিণত জাতীয় স্বার্থ’। আর সবচেয়ে জরুরি হলো, নিজেদের ভোটব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে ভোটার তালিকা, নির্বাচন কমিশন ও ফলাফলে মানুষের আস্থা অটুট থাকে।
আন্দোলন কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট: দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা শুধু ভোট দিয়েই ক্ষান্ত নন, ভোটের প্রক্রিয়াকেই প্রশ্ন করছেন। আমাদের শিক্ষা হলো, প্রতিবেশীর সংকটে উল্লসিত না হয়ে নিজের ঘর গোছানো। আর যাঁরা বাইরের ভরসায় ফেরার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের জন্য কথাটা সহজ— বৈধতা আমদানি করা যায় না, তা অর্জন করতে হয় নিজের মানুষের কাছ থেকে।
