ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনদের মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের স্টাফ নার্স ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রোগীর শ্বশুর, শাশুড়ি ও শ্যালক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।
তাদের দাবি, অসুস্থ রোগীর চিকিৎসার অনুরোধ করায় প্রথমে রোগীকে মারধর করা হয়। পরে তাকে বাঁচাতে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের পাঁচ কর্মীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন রোগীর শ্বশুর মো. আসাদুল্লাহ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চার নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের অভিযোগ, রাত ৮টার দিকে কুমিল্লার তিতাস থেকে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া ইয়াকুবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢামেকে আনা হয়। পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চিকিৎসা না পেয়ে অনুরোধ জানালে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে রক্ষা করতে গিয়ে তার শ্বশুর আসাদুল্লাহ, শাশুড়ি মমতাজ বেগম ও শ্যালক সিয়াম হোসেন মারধরের শিকার হন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে ভুক্তভোগী মমতাজ বেগম যুগান্তকে বলেন, তার মেয়ের জামাই ইয়াকুব কুমিল্লার তিতাস থানার আলমপুর এলাকায় মারামারির ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। শনিবার রাত ৮টার দিকে তারা হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও রসিদ জমা দেন। এরপর তাদের অপেক্ষা করতে বলা হয়। রাত ১১টা পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসা শুরু না হওয়ায় ইয়াকুবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। তিনি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েন।
মমতাজ বলেন, রাত ৮টা থেকে বারবার অনুরোধ করছিলাম, আমার মেয়ের জামাইয়ের অবস্থা খারাপ, চিকিৎসা দেন। কিন্তু আমাদের শুধু সিরিয়ালে থাকতে বলা হয়। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে তাকে চার নম্বর কক্ষের পাশে নেওয়া হয়। সে আর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্টাফদের বলে, সে কুমিল্লা থেকে এসেছে, আর কষ্ট সহ্য করতে পারছে না। এ কথা বলার পর পাঁচজন স্টাফ তাকে ধরে ভেতরে নিয়ে যায়। পরে বেশি কথা বললে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। পরে তাকে মারধর করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী মেয়ের জামাইকে মারধর করতে দেখে এগিয়ে গিয়ে বলেন- পাঁচ ঘণ্টা ধরে রোগী কষ্ট পাচ্ছে, চিকিৎসা না দিয়ে কেন মারধর করছেন? তখনই তার নাকে ঘুসি মারা হয়। নাক ফেটে রক্ত পড়তে থাকে, পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে যায়। এরপর আমার ছেলে সিয়াম প্রতিবাদ করলে তাকেও চার-পাঁচজন মিলে মারধর করে। আমি বাইরে থেকে দেখে ছেলেকে বাঁচাতে ভেতরে যাই। দেখি, ছেলেকে মাটিতে ফেলে ঘুসি মারা হচ্ছে। তাকে বের করে দেওয়ার সময় পেছন থেকে স্টিলের পাইপ দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করা হয়। আমি মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যাই।
মমতাজ আরও বলেন, এরপর এক কর্মী কাঁচি নিয়ে তার দিকে তেড়ে আসেন। ভয়ে তিনি দরজায় ধাক্কা দিয়ে বাইরে থাকা লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। বাইরে থেকে লোকজন মারামারি থামাতে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। দরজা খোলার পর একজনের হাতে বড় ছুরি দেখতে পান বলেও দাবি করেন তিনি। আতঙ্কিত হয়ে তারা সেখান থেকে চলে আসেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল ৯টায় প্রশাসনিক ভবনে বসে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখেননি বলে অভিযোগ করেন মমতাজ। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এভাবে মারধরের শিকার হলাম—এটা কোনো দেশের আইন? আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
স্বামী আসাদুল্লাহ বলেন, মেয়ের জামাইকে ভালো চিকিৎসা করানোর জন্য ঢাকা মেডিকেলে এনেছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীদের হাতে আমরা লাঞ্ছিত হয়েছি। আমার নাকে ঘুসি মেরে ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার স্ত্রী ও ছেলেকেও মারধর করা হয়েছে।
৫৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তি জানান, তার ও স্ত্রীর চিকিৎসা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করানো হয়েছে। ঘটনার পর রক্তমাখা পাঞ্জাবিসহ তাদের কাপড়চোপড় সংরক্ষণে রয়েছে বলেও জানান পরিবারের সদস্যরা।
রোগীর শ্যালক সিয়াম হোসেন বলেন, প্রথমে আমার দুলাভাইকে মারধর করা হয়। তাকে বাঁচাতে গেলে আমার বাবার নাকে ঘুসি মারা হয়। এরপর বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে আমিও মারধরের শিকার হই। পরে মা এগিয়ে গেলে তার মাথায় স্টিলের পাইপ দিয়ে আঘাত করা হয়। তার দাবি, মোট পাঁচজন এ হামলায় জড়িত ছিলেন। ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাস অনুযায়ী পরদিন সকাল ৯টায় প্রশাসনিক ভবনে আলোচনার কথা থাকলেও তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি। এ কারণে তারা থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।
আসাদুল্লাহর লিখিত অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে তুহিন নামের এক স্টাফ নার্স, জাকির হোসেন, তিতাস হোসেন, মো. সালাম ও অফিস সহকারী জাকির হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা আসাদুল্লাহ, তার স্ত্রী, ছেলে সিয়াম ও মেয়ের জামাই ইয়াকুবকে মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন। তার স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম এবং তার নাক ফাটিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার এসআই মনিরুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে ফোনে খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে খালি আপনারা সাংবাদিকরা ফোন দেন। আপনাদের কাছে কি আমি জবাব দেব? আমরা রিপোর্ট দেব থানায়। সকাল থেকে আরও সাংবাদিক ফোন দিছে। আপনাদের কাছে বলতে বাধ্য নই। ফালতু সাংবাদিক। এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা এবং হোয়াটসঅ্যাপেও খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি।