নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। ছবি: খবরের কাগজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ করে মানসম্মত নির্বাচন নিশ্চিত করা এই কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ–এমন মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তার মতে, নির্বাচনি আইনের সংস্কার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, ভোটারদের সচেতন করা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে সম্পৃক্ত করার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ ইসি মোকাবিলা করেছে। এ ছাড়া আগামী বছর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে ইসির পরিকল্পনা, প্রত্যাশাসহ নানা বিষয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন এই নির্বাচন কমিশনার। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস।
খবরের কাগজ: বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল? সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: পরিস্থিতি এমন ছিল যে যাকে আমি অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের সমষ্টি বলব। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে ধারণ করে একটি মানসম্মত নির্বাচন আয়োজন করা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল নির্বাচনি আইন ও বিধিবিধানের সংস্কার ও পরিমার্জন; নির্বাচনি ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং এতদিন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে সম্পৃক্ত করা। এত অল্প সময়ে যথাযথ নীতিমালা ও মান অনুসরণ করে এসব কাজ করা সহজ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বিঘ্নে নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বও আমার ওপর ছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আমরা হয়রানিমুক্ত ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের আয়োজন করতে পেরেছি। এটি শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের ভাবমূর্তি উন্নত করেছে।
আরও পড়ুন
খবরের কাগজ: সঠিক ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে কমিশনের পরিকল্পনা কী?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: চলমান বাস্তবতায় এ দেশে ভোটার শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ কার্যক্রম হতে হবে নিবিড়, ধারাবাহিক ও ব্যাপক। কারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকে এখনো জানেন না কীভাবে ভোট দিতে হয়। ফলে ভোট নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটে। অনেকে নিজের মৌলিক নাগরিক অধিকার সম্পর্কেও সচেতন নন। যথাসময়ে ভোটার হন না। কর্মক্ষেত্র বা ঠিকানা পরিবর্তন হলেও ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেন না। শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যেও এ ধরনের অসচেতনতা দেখা যায়। ভোটার শিক্ষার পরিসর শুধু ভোট দেওয়ার পদ্ধতি শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ভোটের মূল্য বোঝা, ভোট নষ্ট না করা, টাকার বিনিময়ে ভোট না দেওয়া, ভয়ভীতি বা প্রভাবের মুখে নিজের পছন্দের বাইরে ভোট না দেওয়া–এসব বিষয়েও সচেতনতা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
খবরের কাগজ: ভোটার তালিকা ও এনআইডিতে ভুল তথ্য, তথ্যের গরমিল এবং সংশোধনে ভোগান্তির নানা অভিযোগ রয়েছে। সমাধানে ইসির পরিকল্পনা কী?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নাগরিকদের অসচেতনতা এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকে নিজের ফরম নিজে পূরণ করতে পারেন না। এই দুটি সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রায়ই দেখি, কারও শিক্ষাগত সনদে এক ধরনের তথ্য, জন্মনিবন্ধনে আরেক ধরনের তথ্য; আবার পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন নথিতে তথ্যের এই অমিল থাকলে সংশোধন জটিল হয়ে পড়ে। তথ্য টাইপ করার ভুল বা সাধারণ কোনো ভুল সহজেই সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু একেক নথিতে একেক রকম তথ্য থাকলে তা যাচাই করতে হয় এবং সংশোধন কঠিন হয়ে যায়। এ সুযোগে বিভিন্ন দুষ্টচক্রও সক্রিয় হয়। তাই শুরুতেই সঠিক তথ্য দিয়ে ভোটার হওয়া জরুরি। ফরম নিজে পূরণ করতে হবে। এ জন্য কারও মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করা যায়।
আরও পড়ুন
খবরের কাগজ: এনআইডি সেবা ঘিরে দালালচক্রের তৎপরতা এখনো রয়েছে। এসব রুখতে কমিশনের পদক্ষেপ কী?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাইরের কিছু দালাল সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। এসব রুখতে কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ডিজিটাল ও সরাসরি নজরদারি–দুই ধরনের কার্যক্রমই বাড়ানো হয়েছে। কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণের পর কয়েক শ ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে কমিশনের অভ্যন্তরীণ জনবলও রয়েছে। আমাদের বার্তা স্পষ্ট–কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। অনলাইনে আবেদন করবেন। নির্ধারিত সময়ে নিকটস্থ অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন। প্রথমবার এনআইডি পাওয়ার জন্য কোনো টাকা দেওয়ার কথা নয়। কেউ টাকা চাইলে তা অপরাধ। আর একবার এনআইডি হয়ে গেলে ঠিকানা পরিবর্তনে নতুন করে এনআইডি করার প্রয়োজন নেই। শুধু নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হবে। নিজের কাজ নিজে করুন, কাউকে একটি পয়সাও দেবেন না।
খবরের কাগজ: বিগত সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার যে চ্যালেঞ্জ ছিল, সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলো?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: এ ক্ষেত্রে এমন সব চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করেছি, যা অনেকটা অজানা পথে যাত্রার মতো ছিল। কারণ জানতাম না, ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। কোন পদ্ধতিতে ভোট হবে, তা নিয়ে নানা মতভেদ ছিল। আমরা কমিশনে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রথমত, সমাধান হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব-দেশীয় প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায়। দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থার সম্পদ ও অভিজ্ঞতা নির্বাচন কমিশনের অধীনেই থাকবে। এখন বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা জানতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এটি সহজ হলে বিশ্বের আরও অনেক দেশ আগেই এই ব্যবস্থা চালু করত। প্রবাসীদের বিপুল আগ্রহও এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তৎকালীন সরকারপ্রধানের প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে ইসি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।
খবরের কাগজ: এ দেশের প্রবাসী ভোটের অভিজ্ঞতা নিতে নেপালের ইসির প্রতিনিধিদল এসেছিল। তারা কী বলল?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: দেশটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছি। এর আগে কলম্বোয় একটি আয়োজনে পাঁচটি দেশের নির্বাচন কমিশন ও প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের এই মডেল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে আন্তর্জাতিক নির্বাচনব্যবস্থাসংক্রান্ত একটি সংস্থার সহায়তা ছিল। তখন থেকেই তারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। সম্প্রতি নেপালের বড় একটি প্রতিনিধিদল ইসিতে এসেছিল। বিস্তারিতভাবে অভিজ্ঞতা তারা জানতে চেয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে তারাও এই ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আগ্রহী। আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি। আশা করি, বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে এবং এর বাইরেও এই মডেল চালু হতে পারে।
খবরের কাগজ: সামনে ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন রয়েছে। এসব নির্বাচনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ কী? জানুয়ারিতে কি ইউপি নির্বাচন শুরু করা সম্ভব হবে?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: আমাদের পরিকল্পনা ছিল আগামী বছরের মে মাসের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করা। তবে সময়সূচি নির্ধারণে ৬ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষা, রমজান ও এসএসসি পরীক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আমরা জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু করতে আশাবাদী। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে সময় সীমিত থাকায় জানুয়ারি ও মে মাসকে কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বা হবে, সেগুলোর নির্বাচন শেষ করতে চাই। অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনও আইন অনুযায়ী যথাসময়ে আয়োজনের চেষ্টা থাকবে।
খবরের কাগজ: আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে গণমাধ্যমের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: গণমাধ্যমের কাছে আমার প্রত্যাশা মূলত দুটি। প্রথমত, গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজে সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করব। দ্বিতীয়ত, সংবাদ হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ। প্রয়োজনে সংবাদ প্রকাশে কিছুটা দেরি হলেও পাঁচজনের সঙ্গে তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা ভালো। অপ্রয়োজনীয় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা উচিত নয়। ইসির অন্যতম সহায়ক শক্তি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। মানুষ যেন সঠিক তথ্য জানতে পারে, সে জন্য গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ভীতিহীন, সহিংসতামুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনি সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।
খবরের কাগজ: দৈনিক খবরের কাগজের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আপনার প্রত্যাশা কী?
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ: খবরের কাগজ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পত্রিকাটি আমি দেখি এবং পড়ি। গত দুই বছরে আপনাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দেখেছি, নির্বাচনবিষয়ক সংবাদগুলো অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিবেশন করা হয়েছে। তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে খবরের কাগজের সব কর্মীকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।
আশা করি, ভবিষ্যতেও আপনারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করবেন। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গণমাধ্যমও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কাজে গণমাধ্যম সুদৃঢ় ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করি। নির্বাচন কমিশনসহ সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি। খবরের কাগজের জন্য আবারও শুভ কামনা।
