প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি চান, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বগুড়াও এগিয়ে যাক। বগুড়াকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও শিল্পের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান রুমন।
বৃহস্পতিবার বগুড়ার উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমন বলেন, বগুড়াকে কোন অবস্থানে দেখতে চান, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, “বগুড়াকে কেমন দেখতে চান, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটি পরিকল্পনা রয়েছে।”
বাংলাদেশ প্রতিদিনের উদ্যোগে বগুড়ার মমো ইন কনভেনশন সেন্টারে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লতিফুর রহমান একরাম (লতন একরাম)।
সভায় বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ, শিল্প ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এর মধ্যে অন্যতম বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এই রেলসংযোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি যাত্রী পরিবহন, কৃষিপণ্য সরবরাহ এবং শিল্পপণ্যের বাজারজাতকরণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বগুড়ায় একটি মাল্টিমোডাল বিমানবন্দর নির্মাণের প্রস্তুতিও অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ, যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের সড়ক নির্মাণ এবং নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো চার লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। যানজট নিরসন ও নগরায়ণকে গতিশীল করতে প্রাথমিক কাজের জন্য ৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৃথক ২ হাজার কোটি টাকার একটি পরিকল্পনার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়। তবে এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ব্যয়, অনুমোদিত বরাদ্দ এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও অর্থ ব্যয়ের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বগুড়ার মাতিডালী থেকে বনানী পর্যন্ত সড়ক ৬০ ফুট প্রশস্ত করার বিষয়ে তারেক রহমানের আগের একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন রুমন। তিনি বলেন, সড়ক সম্প্রসারণের ফলে দোকানপাট, বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয়দের একাংশ আপত্তি জানিয়েছিলেন।
রুমনের মতে, তখন জনসাধারণের আরও বেশি সহযোগিতা পাওয়া গেলে সড়কটি ৮০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারত। এতে ভবিষ্যতে যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া এবং নগরের সম্প্রসারণ সহজ হতো।
তাঁর বক্তব্যে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সম্পত্তির অধিকার ও জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার গুরুত্ব উঠে আসে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পে জনমত গ্রহণ, স্বচ্ছ ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রুমন গত ১৭ বছরে বগুড়ার উন্নয়নের গতিও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এ সময়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
এ ছাড়া প্রয়াত আরাফাত রহমানের উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়ামের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, নির্মাণের পরও স্থাপনাটি প্রত্যাশিত সম্ভাবনা অনুযায়ী কাজে লাগানো যায়নি।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রস্তাবিত আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আধুনিক ক্রীড়া প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ বাড়তে পারে। শিল্পায়নের অংশ হিসেবে একটি বিসিক শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এটি বাস্তবায়িত হলে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
বগুড়ার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশলশিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল, অর্থায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বহুমুখী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ হলে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। অন্যদিকে, উপজেলায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে এ জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সভায় বগুড়া পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) এবং বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান গঠিত হলে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিকল্পিত নগরায়ণে সমন্বয় বাড়তে পারে।
২০২৬ সালে বগুড়া সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ায় নগরবাসীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত নতুন সিটি করপোরেশনের কাছে সড়ক উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বগুড়ার উন্নয়নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রুমন ও মীর শাহে আলম। প্রস্তাবিত রেলপথ, বিমানবন্দর, ক্রীড়া কমপ্লেক্স, শিল্পপার্ক, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হলে বগুড়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন, সময়মতো বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর। উন্নয়নের সুফল যেন শুধু শহরকেন্দ্রিক না থাকে, সে জন্য জেলার গ্রামীণ সড়ক, কৃষিপণ্যের বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৃষিপ্রধান জেলা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে জেলাটিকে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, উন্নয়নের ঘোষণাগুলোকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপান্তর করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল পৌঁছে দেওয়া।
