তিস্তা সেচ প্রকল্পের খালে পানি আছে, অথচ সেই পানি দিয়ে চাষাবাদ করতে পারছেন না খালসংলগ্ন অনেক জমির কৃষক। কোথাও জমির তুলনায় খালের পানির স্তর নিচে, কোথাও আবার সেচের পানি পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় শাখা খালের অভাব। ফলে সেচের পানি হাতের কাছে থাকলেও তা জমিতে তুলতে নির্ভর করতে হচ্ছে ডিজেলচালিত ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ওপর। এতে প্রতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে কৃষকের। তিস্তা সেচ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সেচব্যবস্থা চালুর ২৬ বছর পার হলেও খালসংলগ্ন কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পানি পৌঁছানোর কার্যকর সমাধান হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, সমস্যা সমাধানে বারিড পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং সৌরচালিত পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেচসুবিধা থেকে বঞ্চিত কৃষক দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২-৬৮ অর্থবছরে বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্প পাইলট আকারে বাস্তবায়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে মডেল স্টাডির ভিত্তিতে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানীতে ১৯৭৯ সালে তিস্তা ব্যারাজের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এর পাশাপাশি ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছর থেকে সেচখাল নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ১৯৯০ সালে তিস্তা ব্যারাজ উদ্বোধন করা হয়। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০০০ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে তিস্তা ক্যানেল থেকে সেচসুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তিস্তা নদীর পানি মাধ্যাকর্ষণনির্ভর বা গ্রাভিটেশন পদ্ধতিতে সরবরাহের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রকল্পটির মোট এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে বাস্তবায়িত এলাকার পরিমাণ ১ লাখ
৩৪ হাজার ৩১০ হেক্টর। সেচযোগ্য জমির পরিমাণ ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে বর্তমানে ৮৪ হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা চালু রয়েছে। ছয়টি জেলা ও ২৫টি উপজেলা নিয়ে প্রকল্পটির বিস্তৃতি থাকলেও বর্তমানে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ১২ উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু আছে। উপজেলাগুলো হলো— নীলফামারী সদর, জলঢাকা, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, ডিমলা, রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর ও খানসামা।
খালে পানি থাকলেও জমিতে পৌঁছায় না
সরেজমিন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার শেরপুর স্লুইসগেটের দক্ষিণ পাশে গিয়ে দেখা যায়, ক্যানেলে পানি থাকলেও আশপাশের মোল্লাপাড়া, দরগাপাড়া, কুটিপাড়া, দাড়ারপাড়, ভাদুপাড়া, শিয়ালগাড়ি, গইলবাড়ি, মণ্ডলপাড়া, মুচিপাড়া ও অবিনাশপাড়ার কয়েক হাজার একর জমিতে ডিজেলচালিত পাম্পের সাহায্যে সেচ দেওয়া হচ্ছে। শুধু তারাগঞ্জ নয়, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জসহ প্রকল্পের দূরবর্তী প্রান্তের অনেক জমিও প্রয়োজনীয় সেচসুবিধা পাচ্ছে না। বিশেষ করে অতিরিক্ত উচ্চতায় পানি তোলার ব্যবস্থা না থাকায় এসব জমিতে খালের পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্প এলাকার অনেক স্থানে প্রধান বা দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচখালের পানির স্তর জমির তুলনায় নিচে। কোথাও খাল পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও প্রকল্পের শেষপ্রান্তে পানির চাপ কম, আবার কোথাও জমির উচ্চতা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক প্রবাহে পানি পৌঁছায় না। এ ছাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক স্থানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের শাখা খাল নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে খালে পানি থাকলেও তা জমিতে পৌঁছানোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ পরিস্থিতিতে কৃষক ডিজেলচালিত লো-লিফট পাম্প, শ্যালো টিউবওয়েল ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচকাজ চালাচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে কৃষকের লাভ।
বাড়তি সেচ খরচে বিপাকে কৃষক
তারাগঞ্জের কুশশা ইউনিয়নের শেরপুর এলাকার কৃষক যোগ্য রায় বলেন, এখানের ক্যানেলটা বেকার। ক্যানেলে অনেক পানি থাকা সত্ত্বেও আমরা জমিতে উঠাইতে পারি না। দুই বছর আগে আমরা অনেক চেষ্টা করেও পানি উঠাইতে পারিনি। এখানে শত শত বিঘা জমিতে শ্যালো মেশিন ও মোটর লাগিয়ে পানি দেওয়া হয়। প্রতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি পানি দিতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এই খরচ না দিলে শ্যালো মেশিনের লোকজন পানি দেয় না। ক্যানেল থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি পেলে আমাদের খরচ অনেক কম হতো।
শেরপুরের আরেক কৃষক শুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘ক্যানেল থাকিয়া হামার লাভ কী, যদি উপকারে না হয়? পানি দিতে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার টাকা নেয়। এই তো কৃষক হামার কষ্ট। হামরা চাই, সরকার থাকি সোলার পাম্প করি দেউক। তাহলে বিনামূল্যে পানি পাব।’
সয়ার কুটিপাড়ার আরেক কৃষক আবু হোসেন বলেন, শেরপুর স্লুইসগেটের দক্ষিণ পাশের কৃষক এখনও ক্যানেলের পানি পাচ্ছেন না। কারণ জমির তুলনায় ক্যানেলের পানির স্তর সব সময় প্রায় এক ফুট নিচে থাকে। তারমতে, জমিতে পানি সরবরাহের জন্য ক্যানেলের পানির স্তর জমির চেয়ে অন্তত এক ফুট উঁচুতে থাকা প্রয়োজন। তবে এভাবে পানির স্তর বাড়ালে ক্যানেলের পাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড সৌর প্যানেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
পরিকল্পনার ঘাটতি ও বাস্তবায়ন-জটিলতা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদীবিষয়ক গবেষক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা। কিন্তু প্রকল্পটি পুর্ণোদ্যমে চালু হওয়ার পরও কখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। সর্বোচ্চ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর চাষাবাদ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় অনেক জায়গায় খাল নির্মাণ করা হলেও সেখানে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যায়নি। এর পেছনে পানির সংকটের পাশাপাশি পরিকল্পনার ঘাটতিও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খালে পানি থাকা সত্ত্বেও কৃষক সেচসুবিধা না পাওয়ার বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিরই ইঙ্গিত দেয়। তারমতে, সমস্যাটি একদিকে পানির স্বল্পতার, অন্যদিকে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের উপপ্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট) কৃষিবিদ অমলেশ চন্দ্র রায় বলেন, প্রধান খালে পানি থাকলেও শেরপুর স্লুইসগেটের দক্ষিণ দিকে কাজীরহাট ও বার্নিহাট এলাকায় প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের খাল নেই। ফলে প্রধান খালের পানি সেখানে জমিতে পৌঁছানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। প্রকল্পের আওতায় পার্বতীপুর পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে ওই এলাকায় খালের পানির স্তর ও জমির উচ্চতা প্রায় সমান হওয়ায় সেচের জন্য শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলতে হয়। তিনি বলেন, খাল নির্মাণ করতে গেলে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়। এতে জমির ক্ষতি হয়, পাশাপাশি অধিগ্রহণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও অনেক সময় লাগে। এসব কারণে পরিকল্পনায় থাকলেও অনেক খাল নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। সে সময় আপাতত প্রধান খাল নির্মাণ করে পরবর্তী সময়ে অন্য খালগুলো করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সমস্যা সমাধানে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অমলেশ চন্দ্র রায় বলেন, প্রথম পর্যায়ে লো-লিফট পাম্পের (এলএলপি) মাধ্যমে পানি তুলে বারিড পাইপ পদ্ধতিতে জমিতে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো এ ব্যবস্থায় পাইপের মাধ্যমে পানি বিভিন্ন জমিতে পৌঁছে দেওয়া যাবে। পাশাপাশি প্রধান খাল থেকে সৌরচালিত পাম্পের সাহায্যে যত দূর সম্ভব পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মো. মিজানুর রহমান বলেন, খালসংলগ্ন জমিতে পানি না পৌঁছানোর বিষয়টি তাদের জানা আছে। সাধারণত প্রধান খাল থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের এবং সেখান থেকে তৃতীয় পর্যায়ের খাল নির্মাণ করে জমিতে পানি সরবরাহ করা হয়। এসব খালের বিভিন্ন আউটলেট দিয়ে জমিতে পানি প্রবেশ করে; কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক খাল নির্মাণ করা যায়নি। এর প্রধান কারণ ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা। তিনি বলেন, ওই এলাকায় আগামী বছর আরও দুটি খাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে কৃষক এক পাশ থেকে অন্য পাশে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পানি নিচ্ছেন। পানি সরবরাহের সুবিধা বাড়াতে বারিড পাইপ বসানোর কাজও নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থা চালু হলে আশপাশের জমিগুলো সেচের আওতায় আসবে। জমির উচ্চতার কারণে যেসব স্থানে পানি তোলা কঠিন, সেখানে সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা হবে।
প্রকৌশলী মিজানুর রহমান আরও বলেন, প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ডিসেম্বরের মধ্যে সংশোধন হলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। প্রথম পর্যায়ে বারিড পাইপ বসানো হবে, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি কিছু স্থানে খাল মেরামতের কাজ চলছে। মেরামত শেষ হলে খালে পুর্ণমাত্রায় পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমেও কৃষক পানি তুলতে পারবেন।
