ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগে বাংলাদেশের টেস্ট দল ঘোষণা নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তা লিটন দাসের ফিটনেস, আর সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মাঝের ওভারগুলোতে স্পিনারদের উইকেট না পাওয়ার সমস্যা। সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন জাতীয় দলের নির্বাচকেরা। এর মধ্যেই ঘরোয়া ক্রিকেটে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের খুঁজতে কক্সবাজারে জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) ম্যাচ দেখতে গেছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগে টেস্ট দল ঘোষণা, লিটনের চোটের সর্বশেষ অবস্থা, প্রস্তুতি ম্যাচে নতুনদের সুযোগ এবং স্পিনারদের বিকল্প খোঁজা-সবকিছুতেই গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচক প্যানেল। প্রধান নির্বাচক জানিয়েছেন, ২২ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে টেস্ট স্কোয়াড ঘোষণা করা হতে পারে। তবে লিটনকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মেডিকেল দলের মূল্যায়নের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
লিটনের ফিটনেসের ওপর নির্ভর করছে দল ঘোষণা
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ সামনে রেখে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাগুলোর একটি লিটন দাসের ফিটনেস। চোট থেকে ফিরলেও এখনো কিছু শারীরিক সমস্যা রয়ে গেছে তাঁর। চলছে স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষা। তাই টেস্ট দলে লিটনকে রাখা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মেডিকেল দলের প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচক প্যানেল।
হাবিবুল বাশার বলেছেন, ‘আমরা হয়তো ২৩ বা ২৪ তারিখে দল ঘোষণা করব। তবে ২২ তারিখেও ঘোষণা করতে পারি। লিটনের ফিটনেস টেস্টের ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে। তার চোট নিয়ে অবশ্যই আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। সে ফিরে এসেছে, তবে ছোটখাটো কিছু সমস্যা বা নিগলস আছে।’
লিটনকে টেস্টে পাওয়ার ব্যাপারে অবশ্য আশাবাদী প্রধান নির্বাচক। তিনি বলেন, ‘তারপরও আমরা আশাবাদী, লিটনকে টেস্ট ম্যাচে পাব। তবে এ জন্য আমাদের আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। সে বর্তমানে স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তার চিকিৎসাপ্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মেডিকেল টিমের কাছ থেকে তার ফিটনেস রিপোর্ট পাওয়ার জন্য হয়তো আমাদের ২৪ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
অর্থাৎ, লিটনের খেলার বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না বাংলাদেশ। মেডিকেল দলের মূল্যায়নের পরই তাঁর টেস্ট দলে থাকা না-থাকার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রস্তুতি ম্যাচে সুযোগ পাবেন নতুনেরা
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রস্তুতি ম্যাচেও খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিসিবি। একই সময়ে জাতীয় ক্রিকেট লিগ চলায় নিয়মিত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের ওপর বাড়তি চাপ দিতে চাইছেন না নির্বাচকেরা। সে কারণে প্রস্তুতি ম্যাচের দল সাজানো হচ্ছে মূলত এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে, যাঁরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার সুযোগ পান না।
হাবিবুল বাশার বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট চলমান রয়েছে, আর প্রস্তুতি ম্যাচটি পড়েছে ঠিক এর মাঝখানে। যেহেতু প্রস্তুতি ম্যাচটি মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রস্তুতির জন্য, তাই আমরা চেষ্টা করেছি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ব্যস্ত খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো খেলোয়াড় চার দিনের একটি ম্যাচ শেষ করার পরপরই আবার চার দিনের আরেকটি ম্যাচ খেললে তার টানা আট দিনের খেলার চাপ তৈরি হবে। আমরা চাইনি, এ কারণে তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ুক বা তাদের খেলার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটুক।’
ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশও বিবেচনায় রাখছেন নির্বাচকেরা। এনসিএলে বিভাগগুলোর গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের নিজ নিজ দলের হয়ে খেলার সুযোগ দিতে চান তাঁরা। তবে যাঁদের নিয়ে জাতীয় দলের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের দু-একজনকে প্রস্তুতি ম্যাচে দেখা হতে পারে।
প্রধান নির্বাচকের ভাষায়, ‘এ মুহূর্তে প্রথম শ্রেণির দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। তাই দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের আমরা এই প্রস্তুতি ম্যাচের জন্য সরিয়ে নিতে চাইনি। তবে দু-একজন খেলোয়াড়কে আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি, যাদের নিয়ে আমাদের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তুতি ম্যাচে মূলত নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া হবে।’
এই প্রস্তুতি ম্যাচ নির্বাচকদের জন্য তাই শুধু সিরিজের প্রস্তুতি নয়, জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের সামর্থ্য যাচাইয়েরও সুযোগ।
মাঝের ওভারে উইকেট চান নির্বাচকেরা
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট বের করে আনা। প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি থামাতে এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে এই সময়ে স্পিনারদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। কিন্তু উইকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব থাকায় বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে নির্বাচকদের।
এ জন্য শুধু জাতীয় দলের বর্তমান স্পিনারদের দিকে তাকিয়ে থাকতে চাইছেন না তাঁরা। নজর রাখা হচ্ছে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলা স্পিনারদের ওপরও। এনসিএল শেষ হওয়ার পর ডি-থ্রি টুর্নামেন্টেও তাঁদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করা হবে।
হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের তিনজন নির্বাচক বিভিন্ন ভেন্যুতে গিয়ে খেলা দেখছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিভিন্ন বিভাগের হয়ে বেশ কয়েকজন স্পিনার খেলছেন। আমরা তাঁদের পারফরম্যান্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করা কয়েকজন স্পিনারকে দ্রুত জাতীয় দলের বিবেচনায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে নির্বাচকদের। এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘আশা করছি, এনসিএল শেষ হওয়ার পর সামনে আমাদের আরও একটি টুর্নামেন্ট রয়েছে, ডি-থ্রি। সেখানেও খেলোয়াড়দের দেখার সুযোগ হবে। আমার মনে হয়, এই দুটি টুর্নামেন্ট দেখার পর আমরা কয়েকজন খেলোয়াড়কে চিহ্নিত করতে পারব, যাঁদের দ্রুত জাতীয় দলের বিবেচনায় আনা যায় কিংবা ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনায় রাখা যায়। তাই এই দুটি টুর্নামেন্ট আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
নজর এখন ঘরোয়া ক্রিকেটেও
কক্সবাজারে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের ম্যাচ দেখতে গিয়ে গত তিন দিন ধরে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করছেন হাবিবুল বাশার। ব্যাটারদের ব্যাটিং, বোলারদের কার্যকারিতা ও ফিল্ডারদের দক্ষতা-সবকিছুই থাকছে নির্বাচকদের নজরে। অন্য দুই নির্বাচকও বিভিন্ন ভেন্যুতে গিয়ে ম্যাচ দেখছেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগে তাই নির্বাচকদের সামনে একাধিক কাজ। লিটনের ফিটনেসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সময়মতো টেস্ট স্কোয়াড ঘোষণা করা, প্রস্তুতি ম্যাচে নতুনদের যাচাই করা এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জন্য কার্যকর স্পিনার খুঁজে বের করা। ঘরোয়া ক্রিকেটের চলমান দুই টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের দল গঠনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
