সেম্বকর্প, পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল, সারবানা জুরং ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে উল্লেখ করে ফিলিপ ওং বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণে আগ্রহী।
বন্দর অবকাঠামো, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বাংলাদেশের নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পে ১০০ কোটি ইউএস ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও চলছে আলোচনা। আগামী বছরের মধ্যেই চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রত্যাশা দুই দেশের।
এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) স্থিতি বিপুল হলেও বাংলাদেশে তার তুলনায় বিনিয়োগ এখনো সীমিত। দেশটির পরিসংখ্যান দপ্তর সিংস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ছিল ৮৬ হাজার ৬০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে এফডিআই স্টকের এ পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়নের কাছাকাছি। ২০২৪ সাল শেষে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৩০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের (৯৬ দশমিক ৪৩ টাকায় ১ সিঙ্গাপুর ডলার) কিছু বেশি। তবে যৎসামান্য এ বিনিয়োগকে আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগসংশ্লিষ্টদের মতে, সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন সময়ে আহ্বান জানানো হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এর পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও তা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে না।
বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের আগ্রহের বিষয়ে ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফিলিপ ওং বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগও রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৩০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের কিছু বেশি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৯০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার।’
সেম্বকর্প, পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল, সারবানা জুরং ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে উল্লেখ করে ফিলিপ ওং বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণে আগ্রহী। বে টার্মিনাল প্রকল্প সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। প্রকল্পটিতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ৮০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ইউএস ডলার হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের বাণিজ্য অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বে টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বন্দরের কার্যকারিতা বাড়লে পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময়ের জন্য মাশুল (ড্যামারেজ) এবং জাহাজ চলাচলের সময় কমবে। এতে রফতানিকারক ও আমদানিকারকদের উল্লেখযোগ্য ব্যয় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের আকর্ষণও বাড়বে।’
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বে টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেকওয়াটার নির্মাণ, ড্রেজিং, একটি বহুমুখী টার্মিনাল এবং দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ২০০ কোটি ইউএস ডলারের বেশি হতে পারে। প্রকল্পটি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
বন্দর অবকাঠামোর বাইরে ডিজিটাল অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগ দেখছে সিঙ্গাপুর। ফিলিপ ওং বলেন, ‘বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যে বহুমুখীকরণ, খাদ্যনিরাপত্তায় সহযোগিতা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পের বিকাশে সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে সিঙ্গাপুর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নেও দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ রয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের যাত্রীসংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থা (এপিআইএস) এবং উড়োজাহাজ চলাচল থেকে আয় ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিমসন ও এন্টারপ্রাইজ। পর্যটন খাতেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রগুলোর একটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেম্বকর্পের ৭১ শতাংশ মালিকানাধীন যৌথ উদ্যোগের আওতায় সিরাজগঞ্জে ৪১৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। সেম্বকর্প নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের এ কেন্দ্রটি ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। আর্থিক সেবা খাতেও দেশটির প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি রয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিবিএস ব্যাংক ২০২৩ সালে ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় চালু করে। তবে প্রতিনিধি কার্যালয়ের কার্যক্রমকে সরাসরি ব্যাংক খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪৪ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ইউএস ডলারে। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, ১১৩ কোটি ৯ লাখ ইউএস ডলার। এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতে ২৩ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার, টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে ২২ কোটি ৫ লাখ, কৃষি ও মৎস্য খাতে ১৫ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার ইউএস ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। ব্যাংক খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭০ লাখ ২০ হাজার ইউএস ডলার।
বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায়ও কম। সিংস্ট্যাটের ২০২৪ সালের শেষের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে সিঙ্গাপুরের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২২৬ কোটি ৪০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১ হাজার ৪২ কোটি ৯০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। এ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে আনছে।
বাংলাদেশের বাইরেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও কার্যক্রম বিস্তৃত। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি আঞ্চলিক বিমান পরিবহন খাতেও বিনিয়োগ রয়েছে। ভারতে ভিস্তারা একীভূত হওয়ার পর ২০২৪ সালে এয়ার ইন্ডিয়া গ্রুপে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ২৫ দশমিক ১ শতাংশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার নুসান্তারা অঞ্চলে সেম্বকর্প ও পিএলএন নুসান্তারা পাওয়ার ২০২৫ সালে ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং ১৪ দশমিক ২ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সক্ষমতার ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্প চালু করে।
বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বাংলাদেশের প্রবাসী আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে প্রবাসী আয় এসেছে ১৪৯ কোটি ৩৯ লাখ ইউএস ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে সিঙ্গাপুরের অবস্থান ছিল অষ্টম।
অর্থনীতি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছর পূর্ণ হবে ২০২৭ সালে। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী আয় আসার ধারাবাহিকতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে এ সম্পর্কের সম্ভাবনার সঙ্গে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের বর্তমান পরিমাণের ব্যবধানও স্পষ্ট। বে টার্মিনাল ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মতো অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহকে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগে রূপ দেয়া, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এফটিএর শর্ত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও সমঝোতা ও দরকষাকষির তৃতীয় দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। গত ১১ আগস্ট সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণানের বৈঠক শেষে প্রস্তাবিত চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার প্রত্যাশা জানায় দুই পক্ষ। ওই আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ৩০ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশকে এফটিএ নিয়ে আলোচনাধীন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে।
সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এফটিএর মাধ্যমে পণ্য ও সেবাবাণিজ্যে বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্কসুবিধা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির সুযোগ থাকে। তবে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর এফটিএর শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বাংলাদেশের কোন পণ্য কতটা শুল্কসুবিধা পাবে কিংবা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সুবিধা তৈরি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। চুক্তি সম্পন্ন হলে বাণিজ্য সহজীকরণ ও বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।
