যিনি বলেছিলেন, ‘সত্য বল সুপথে চল, ওরে আমার মন’; গানের সুরে যিনি বলে গেছেন মানুষ ও মানবতার কথা, আজ (১৭ অক্টোবর) সেই কালজয়ী ব্যক্তিত্ব ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। জাত-ধর্মের বিভেদ পেরিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন লালন। তার গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষকে শিখিয়েছেন আত্ম-অনুসন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ।
উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এই সাধককে তার তিরোধান দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন অগণিত ভক্ত ও অনুরাগী। লালনের জীবনদর্শন, সংগীতের মর্মার্থ ও বাউল ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা পোস্টের বিশেষ আয়োজনে কথা বলেছেন তরুণ প্রজন্মের বাউল ও লালনসংগীতশিল্পী সূচনা শেলী...
লালনের গান যে কেউ শিখতে পারেন, গাইতেও পারেন। আমার ক্ষেত্রে, পারিবারিকভাবে যোগসূত্র আছে। আমার বাবার অবদানও রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, অন্য ধরনের গান আর লালন সাঁইজির গানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। অন্য গান শুধু গান, আর সাঁইজির গানের মধ্যে রয়েছে জ্ঞান।
অনেককেই দেখা যায়, লালনের একটি বিচ্ছেদি গানের সঙ্গে আনন্দের নাচ করছেন। এতে যে গানের ভাবধারা নষ্ট হচ্ছে, সেটা তারা বুঝতে পারেন না।
কিন্তু কেউ যদি গানটি সুর ও তাল ঠিক রেখে মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারেন, তাহলে আমি তাকে শিল্পী বলব। আবার সব শিল্পীরা যে সাঁইজির গানের ভাবধারা বজায় রেখে গান করবেন, এমনটা আশা করা ভুল হবে। কারণ, তাদের অনেককেই দেখা যায়, লালনের একটি বিচ্ছেদি গানের সঙ্গে আনন্দের নাচ করছেন। এতে যে গানের ভাবধারা নষ্ট হচ্ছে, সেটা তারা বুঝতে পারেন না। যারা এসব পরিবেশনা দেখেন বা শোনেন, তারাও বিষয়টি বুঝতে পারেন না। সুতরাং যারা জ্ঞানী, তারা সব সময় সঠিক বিষয়টিই গ্রহণ করবেন।
লালন সাঁইজির প্রাসঙ্গিকতা তত দিন থাকবে, যত দিন বাঙালি জাতি বা বাংলাভাষী মানুষ থাকবে। তার প্রতিটি কথাই একেকটি দর্শন। তার প্রতিটি বাণী একজন মানুষের জীবন গড়ে দিতে পারে। তা বাণী একজন অমানুষকেও মানুষ করে দিতে পারে। এটাই তার মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনের শক্তি। এটাই শিক্ষা।

আমার মনে হয়, আমাদের কাছে যা আছে, সারা পৃথিবীর মানুষ আসলে সেটারই খোঁজ করছে। সাঁইজি বলেছেন,“শাল পটকে কপালের ফ্যার কোষ্ঠার গোনায় দেষ জুড়েছে, সোনার মান গেলরে ভাই বেঙ্গা এক পিতলের কাছে” অর্থাৎ, আমাদের কাছে এত মূল্যবান সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা সেটির কোনো মূল্য দিতে পারছি না। আমরা সত্যিই অভাগা জাতি। সেই জায়গা থেকে আমার সফলতা হলো, কিছুটা হলেও পৃথিবীর মানুষের কাছে সাঁইজির জ্ঞান পৌঁছে দিতে পেরেছি। আগেই বলেছি, মানুষ যা খুঁজছে, তা আমাদের কাছেই রয়েছে।
যারা লালনের গানে ক্ল্যাসিক্যাল যুক্ত করেন কিংবা অন্যভাবে সুর বিকৃত করেন, তারা আসলে অপরাধী। কোনো প্রজন্মের শিল্পীরই এমন সাহস দেখানো একেবারেই উচিত নয়।
লালনগান পরিবেশনের ক্ষেত্রে বর্তমানে বেশির ভাগ সময়ই সুর বিকৃত করে গাওয়া হয়। বাণী ও সুরে কোনো পরিবর্তন আনার সুযোগ কারও নেই। যারা লালনের গানে ক্ল্যাসিক্যাল যুক্ত করেন কিংবা অন্যভাবে সুর বিকৃত করেন, তারা আসলে অপরাধী। কোনো প্রজন্মের শিল্পীরই এমন সাহস দেখানো একেবারেই উচিত নয়।
এই সমাজে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে আপনাকে বেগ পেতেই হবে। আপনি যে ধারার শিল্পীই হোন না কেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। আর সেই সফল হবে, যে এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারবে।
এবারের তিরোধান দিবসে আমার পরিকল্পনা, সকালে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ফকির লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে গান করা । সেটি শেষ করেই সাঁইজির ধামের উদ্দেশে রওনা দেব। আর তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার বার্তা হলো, লালনের গান বুঝে গাও এবং শোনো।
সাঁইজির একটি গানে বলা হয়েছে—
“তুমি দেখা দিয়ে ভাবের শহর কোথায় গৌড় লুকাইলে?
আমার মতো প্রাণ কাঁদিলে, বুঝবি গৌড় প্রেমের কালে।”
এই ধরনের গানের সঙ্গে নাচা যাবে না। গানের সারমর্ম বুঝে গান করলে দেখবেন, গানের সঙ্গে আর নৃত্য আসছে না, গানের সঙ্গে জ্ঞান আসছে। জীবনের সার্থকতা আসছে।
জয়গুরু, সকলের মঙ্গল হোক।
ডিএ/কেআই
