Published on
:
2 min read
অর্ঘ্য ঘোষ, লাভপুর
সে এক দিন গিয়েছে বীরভূমের লাভপুরের লাঘোষার সরকার পরিবারের। দুর্গাপুজো উপলক্ষে মাস খানেক আগে থেকে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। ১৫ দিন আগে বোধনের মধ্যে দিয়ে সূচনা হতো পুজোর। সপ্তমীতে বাহারি ছাতার নীচে চতুর্দোলায় ময়ূরাক্ষী নদী থেকে দোলা আনা থেকে শুরু করে পুজো চারদিন পাত পেড়ে খেয়েছেন গ্রামের মানুষ। বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ঢাক, ঢোল-সহ পাঁচ দলের বাজনার সঙ্গে পা মিলিয়েছে আট থেকে আশি। সে সব আজ ইতিহাস।
পরিবার সূত্রে খবর, ঢেকা মহালের গোমস্তা ছিলেন সরকার পরিবারের রামচন্দ্র সরকার। সেই সময়ে লাঘোষা গ্রামে কোনও দুর্গাপুজো ছিল না। রামচন্দ্র জমিদারের কাছে পুজো প্রচলনের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। জমিদার পুজোর জন্য প্রতি বছর সংগৃহীত খাজনার একটা অংশ তাঁকে দান করতেন। সেই টাকায় প্রায় তিন শতাধিক বছর আগে মহা ধুমধাম করে চর্তুভুজা দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন রামচন্দ্র। জমিদারি প্রথা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয় খাজনা আদায়ের কাজ। মেলেনি পুজো চালানোর জমিদারের আর্থিক সাহায্য। জৌলুষ কমতে কমতে ৩২ বছর আগে বন্ধ গিয়েছে সেই পুজো। কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। তারপরে নানা প্রতিকূলতায় আর পুজো প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পুজো বন্ধ হলেও থেকে যায় মণ্ডপ, প্রতিমার কাঠামো। ক্রমে ভেঙে পড়ে মণ্ডপ, কাঠামোর খড়-দড়ি খসে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কাঠের কঙ্কাল। সেই 'কঙ্কালেই' প্রতি বার নিয়ম মেনে পুজো দেওয়া হয়েছে। এ বারই নতুন করে মুর্তিপুজোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাস আটেক আগে তৈরি হয়েছে পাকা মণ্ডপও। সেখানে করা হয়েছে প্রতিমার দোমাটির কাজ। পুজো ঘিরে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, পাড়ার বাসিন্দারাও চরম খুশি। কার্তিকচন্দ্র ঘোষ, কার্তিকচন্দ্র মণ্ডল, দীপালি মণ্ডল, বেলি ঘোষরা বলেন, 'আগে আমরা অন্য পাড়ায় পুষ্পাঞ্জলি দিতে যেতাম। এ বার নিজেদের পাড়ায় দেবো।'
সরকার পরিবার বর্তমানে তিন শরিকে বিভক্ত। বড় শরিক ৭২ বছরে অমিয়কান্তি সরকার থাকেন কলকাতায়। মেজ শরিক ৭০ বছরের তপনকান্তি হাওড়া এবং ৬৮ বছরের তাপস কান্তি থাকেন বীরভূমের বোলপুরে। তাঁরা বলেন, 'একটা সময়ে আমাদের পুজোর রমরমাই ছিল আলাদা। পুজো বন্ধ হওয়ার পর গ্রামে বিশেষ একটা যাওয়া হয়ে ওঠে না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই গ্রাম দেখেনি। এ বার মায়ের টানে তাদের পিতৃভূমি দর্শন হয়ে যাবে।' সপরিবার গ্রামে থাকেন ছোট শরিক ৬৯ বছরের অলোককান্তি সরকার। তাঁর ছেলে দেবাশিস বলেন, 'পুজো বন্ধ হয়ে গেলেও আমরা নিয়ম মেনে কাঠামো পুজো করেছি। মায়ের কাছে প্রাণ প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেছি। মা সেই প্রার্থনা পূরণ করেছেন।'
