বেলা ১১টা, ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানায় প্রতিটি ফ্লোরেই কর্মব্যস্ততা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিগস মেশিন দিয়ে সুনির্দিষ্ট মাপে ডেনিমের কাপড় কাটা হচ্ছে। পাশের কর্মীরা সেগুলো সেলাই করে জিন্স, স্কার্ট ও জ্যাকেটে রূপ দিচ্ছেন।
এরপর ওয়াশিং, আয়রনিং, বোতাম ও জিপার লাগানোর পর ব্র্যান্ড লেবেল সাঁটানো হয়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসিপেনির মতো ব্রান্ড। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯০ হাজার কর্মী মিলে প্রতি মাসে ৯৩ লাখ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে।
কিন্তু হঠাৎ করেই কারখানার বাতিগুলো নিভে গেল। এরপর বিকট শব্দে চালু হয়ে যায় চারটি ডিজেল জেনারেটর, সঙ্গে সঙ্গে আবার আলোকিত হলো কারখানাটি। গ্যাসের চাপ কমলেই জেনারেটরগুলো এভাবে চালু হয়ে যায়।
হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটির প্রধান তানুল চক্রবর্তী টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ খারাপ। এখানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। গ্যাসের পর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হলো ডিজেল। গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। বলতে গেলে পুরো অর্থনীতিই ডিজেলের ওপর ভর করে চলে।
প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ দেশটির আমদানিনির্ভর জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। রাশিয়ার আক্রমণের পর শিল্পখাতে গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এটা খুবই খারাপ খবর। এই খাত দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস। সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে। ২০২৫ সালে এই খাত থেকে ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। (হা-মীম গ্রুপই এককভাবে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।)
তবে এই জ্বালানি সংকট শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো গ্লোবাল সাউথে এর প্রভাব পড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সপ্তাহে চার কর্মদিবস চালু করেছে ফিলিপিন্স। পাশাপাশি সরকারি ভ্রমণে বিধিনিষেধ এবং ফ্লাইট বাতিলের মতো পদক্ষেপও নিতে হয়েছে। নাইজেরিয়ায় ডিজেলের দাম ৮৬ শতাংশ এবং তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে পরিবহন এবং জেনারেটরচালিত বিদ্যুতের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে কৃষিপণ্য ও খাদ্যের দামও বেড়েছে।
গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল সতর্ক করে বলেছিলেন, সবচেয়ে গরিব মানুষেরা, যারা তাদের আয়ের বেশিভাগ অর্থই খাবার আর জ্বালানি কিনতে খরচ করে, এতে করে তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে।
জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঢাকায় হাসপাতাল ও ফার্মেসির মতো জরুরি সেবা ছাড়া সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। বাণিজ্যিক এলাকার বিলবোর্ডগুলোর আলো সন্ধ্যার পরপরই নিভিয়ে ফেলা হয়। দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে এক ঘণ্টা আগে। গ্রামাঞ্চলে মানুষকে দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্তও লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তার হিসাব। চুলায় গ্যাসের চাপ থাকবে এই আশায় ভোরের আগেই উঠতে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ফ্যান কতক্ষণ চলবে, পেট্রোল পাম্পের লাইন কতদূর যাবে এসব নিয়েই দিন কাটছে। ব্যবসায় ধস নামার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও বাড়ছে। বৈশ্বিক পুষ্টি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ বাংলাদেশি শিগগিরই খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
অভ্যন্তরীণ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত সংকট আরও বাড়িয়েছে। সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করেছে। যার মাশুল হিসেবে বর্তমানে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেকই মেটাতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা আমদানির ওপর নির্ভর করে। জুলাই-আগস্টে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমেছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা এবং দেশে থাকা দুটি ভাসমান রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালের একটিতে আগুন লেগে সাময়িকভাবে বিকল হয়ে পড়া।
ইরান যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। তার ওপর এখন জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের চাপ বাড়ছে। গত মাসে বিরোধী দলের হাজারো সমর্থক লংমার্চ করেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন, নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি খাতই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এটি বিরোধীদের সংগঠিত হওয়ার মূল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সঙ্গে ভূরাজনীতির সংযোগ থাকলেও বাংলাদেশের এই দুর্ভোগের পেছনে রয়েছে নিজস্ব কিছু জটিলতা। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। পতনের পর ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে ফাটল আরও গভীর হয়।
বাংলাদেশ তার বিদ্যুতের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। আর এই কৌশলগত দুর্বলতাকে কূটনৈতিক চাল হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি নয়াদিল্লি। এ ছাড়া হাসিনার আমলের অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞকে ওএসডি করায় সংকট মোকাবিলায় দক্ষতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
শুধু প্রতিবেশী রাজ্যেই নয়, নিজের সীমান্তের বাইরে বড় শক্তির বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর টানাপোড়েনেও ভুগতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশের প্রথম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে ঢাকা ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন (১ হাজার ২৬৫ কোটি) ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার সিংহভাগই এসেছে রাশিয়ার ঋণে। এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাশিয়ান রোসাটম। কেন্দ্রটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়ার কথা থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তা বারবার পিছিয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে রাশিয়ান ব্যাংকে লেনদেন জটিল হয়ে পড়ে এবং আকাশ ও নৌপথে মালামাল পরিবহন ব্যাহত হয়। তবে গত ১১ অক্টোবর সফলভাবে এর প্রথম নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া (চেইন রিয়্যাকশন) সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে এটি উৎপাদনে যাবে; যদিও ঘোষিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ ক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে আরও কয়েক মাসের ধাপভিত্তিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট। এতে শীর্ষস্থানীয় রুশ কর্মকর্তা এবং রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সহায়তাকারী ব্যবসাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ এবং পারমাণবিক জ্বালানি কেনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ঢাকাকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ থেকে বিশেষ অনুমোদন (ওয়েভার) বা স্বীকৃত অর্থপ্রদান মাধ্যম নিশ্চিত করতে হতে পারে।
এদিকে ওয়াশিংটন নিজস্ব বিকল্প সমাধানের প্রস্তাব দিচ্ছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ওপর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এতে মূলত স্মল মডুলার রিয়্যাক্টরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ পরবর্তী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের জ্বালানি পণ্যসহ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পরাশক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকেও নজর রাখছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল গত জুনে মালয়েশিয়া ও চীনে। দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে বেইজিংয়ে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়েছে। এর মধ্যে একটি সরাসরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কয়েকটি চুক্তি এমন করপোরেট গ্রুপের সঙ্গে হয়েছে, যেগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ঢাকা-বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা এই সম্পর্ক ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সূত্রগুলো টাইমকে জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
সব দিক থেকে টানাটানির মুখে পড়ে ঢাকা এখন যেকোনো উপায়ে জ্বালানি স্বনির্ভরতা বাড়াতে মরিয়া। সরকার সম্প্রতি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। এতে সোলার যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে এবং ব্যাটারি স্টোরেজযুক্ত সিস্টেমে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের প্রথমার্ধে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। তবে আগামী পাঁচ বছরের বড় লক্ষ্য পূরণ করতে হলে কাজের এই গতি অন্তত ছয় গুণ বাড়াতে হবে।
সম্প্রতি আয়োজিত ‘২০২৬ বে অফ বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর এক প্যানেল আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম টাইমকে বলেন, ‘ আমরা জ্বালানির একক নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজছি। আমরা সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিককে জ্বালানিতে স্বনির্ভর করে তোলার বিষয়টিও ভেবে দেখছি।’
তবে বাসাবাড়ির জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বেশ ভালো কাজে দিলেও, বেশি বিদ্যুৎপ্রয়োজনীয় কারখানাগুলোর জন্য এটি খুব একটা কার্যকর নয়। দেশজুড়ে বেসরকারি খাতে অন্যতম বৃহৎ সোলার প্ল্যান্ট হিসেবে হা-মীম তাদের কারখানার ছাদে ২৯.২ মেগাওয়াটের সৌর প্যানেল বসিয়েছে। তাদের কর্মকর্তা তানুল চক্রবর্তী জানান, দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা চালু থাকে এই কারখানা। সেখানে সূর্য যখন একদম মাথার ওপর থাকে, কেবল তখন বড়জোর চার ঘণ্টার মতো এই সৌরবিদ্যুৎ কাজে আসে।
দেশে জ্বালানি সংকট চলার পরও হা-মীম গ্রুপের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। গত ৩ বছরে যে ৪০০টিরও বেশি ছোট কারখানা বন্ধ হয়েছে, সেগুলোর কাজের অর্ডার এখন হা-মীম পাচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্ক এড়াতে যেসব বিদেশি ক্রেতা চীন থেকে ব্যবসা সরাচ্ছেন, তারাও হা-মীমকে অর্ডার দিচ্ছে। তবে কারখানা চালুর খরচ অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনের জ্বালানি বিল ২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে এখন ৩ লাখ ডলার ছুঁয়েছে। অন্যদিকে ক্রেতারাও পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। তাই টিকে থাকতে হা-মীমকে তাদের কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হচ্ছে।
হা-মীম গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল মঈন কম্পিউটারে প্রতি ঘণ্টার কাজের হিসাব রাখেন। কোনো কর্মী লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে পড়লে ম্যানেজাররা তার কারণ খোঁজেন এবং বুঝিয়ে বলেন। মঈন বলেন, ‘হতে পারে মেশিনে সমস্যা ছিল, বা কর্মী ক্লান্ত ছিলেন।’ এরপর তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হয়। তবে যারা বারবার ব্যর্থ হন, তাদের বদলে নতুন লোক নেওয়া হয়। কারণ প্রতিদিন সকালেই ফটকে শত শত চাকরিপ্রার্থী সিভি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
মঈন জানান, জ্বালানি সংকট থাকলেও কাজের গতি বা উৎপাদন কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
উৎপাদন বাড়াতে মঈনের এই কড়াকড়ির কারণ স্পষ্ট। পোশাক শিল্পে প্রতিযোগিতা ভীষণ কঠিন। খরচ একটু বাড়লে বা কাজ সামান্য পিছিয়ে গেলেই বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানে সরিয়ে নিতে পারেন। তবে শুধু বিদ্যুৎ পেলেই চলবে না বিদ্যুৎটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক বিদেশি ব্র্যান্ড এখন পরিবেশবান্ধব উপায়ে তৈরি পোশাক কিনতে চায় এবং কয়লা বা তেলের বিদ্যুতের বদলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে জোর দিচ্ছে।
বিশ্বের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান ধরে রাখা যেমন কঠিন, অর্থনৈতিক খাতকে আরও বড় করা তার চেয়েও কঠিন। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, গাড়ি, চিকিৎসাসামগ্রী ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো শিল্প এগিয়ে নেওয়ার বড় পরিকল্পনা দেশের রয়েছে। কিন্তু এসব খাতে যেমন মারাত্মক প্রতিযোগিতা, তেমনি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের দেশে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোচনা করে বড় কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীকে আকর্ষণ করা সম্ভব নয়।
গত মাসে সরকার দেশের নতুন জ্বালানি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যা মূলত সৌর প্যানেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আসবে। একই সাথে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন আধুনিক করার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাস বাড়াতে ৩০০টি নতুন কূপ খোঁড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ।
আরও পড়ুন
আড়াই হাজারের বেশি পোশাক কারখানার প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট। আশা করছি তিন বা চার বছরের মধ্যে হয়তো আর বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দামের কারণে আপাতত স্বস্তির কোনো আশা নেই। এতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষকে কষ্ট সহ্য করতেই হচ্ছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেলকেন্দ্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। জবাবে সৌদি আরবও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
দৈনিক ২২ হাজার পোশাক তৈরি করা ‘ফতুল্লা অ্যাপারেলস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য এটি চরম এক সংকটকাল। মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ না থাকলে পরিস্থিতি অনেক সহজ হতো।
টাইম থেকে অনুবাদ।
ওয়াইএ/এনএফ
