বিয়ের পিঁড়িতে একসঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়া, তারপর আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের নিয়ে বউভাতের আনন্দ। চেনা এই বিয়েবাড়ির ছবিতেই অন্য মাত্রা যোগ করলেন নদিয়ার চাপড়ার নবদম্পতি মাসুদ মণ্ডল ও সোহানা মণ্ডল। বউভাতের এলাহি আয়োজনের পাশাপাশি তাঁদের উদ্যোগে আয়োজিত হল স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির। নতুন দাম্পত্য জীবনের সূচনালগ্নে মানুষের জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার নিয়ে অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তাঁরা। নবদম্পতির এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে শতাধিক মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।
বিয়ে মানেই উৎসব, আনন্দ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে খুশির মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া। বউভাতের অনুষ্ঠানে অতিথিদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, খাওয়াদাওয়া—সব কিছুতেই থাকে বিশেষত্ব। তবে সেই চেনা উদ্যাপনের মধ্যেই রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে ব্যক্তিগত আনন্দকে সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন মাসুদ ও সোহানা। তাঁদের কাছে নতুন সংসার শুরুর আনন্দ শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পৌঁছে গিয়েছে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে।
জানা গিয়েছে, মাসুদ মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। রক্তের অভাবে কোনও রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে রক্তের সন্ধানে ছুটে যাওয়া কিংবা হাসপাতালে গিয়ে রক্তদানের মাধ্যমে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এ ধরনের সামাজিক কাজের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন। সেই মানবিক মানসিকতাকেই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিনে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পাশে পান স্ত্রী সোহানা মণ্ডলকেও।
নতুন জীবনের শুরুতেই স্ত্রীকে পাশে নিয়ে মানবসেবার এই উদ্যোগ গ্রহণ করে মাসুদ মণ্ডল বুঝিয়ে দেন, সামাজিক কাজের জন্য আলাদা কোনও দিন বা বিশেষ উপলক্ষের অপেক্ষা করতে হয় না। জীবনের আনন্দঘন মুহূর্তকেও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব। একই সঙ্গে সোহানা মণ্ডলের অংশগ্রহণও এই বার্তাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দাম্পত্য জীবনের পথচলা শুরু হল এমন এক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে, যেখানে ব্যক্তিগত সুখের পাশাপাশি গুরুত্ব পেল অপরের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার।
মাসুদ মণ্ডলের কথায়, “জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম দিনেই রক্তদানের মাধ্যমে পথচলা শুরু করেছি। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে, জীবনের প্রতিটি দিন যেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। আগামী দিনে আমি ও আমার স্ত্রী দু’জনে মিলে মানুষের বিপদের সময় রক্ত দিয়ে পাশে দাঁড়াতে চাই। মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় মানবিক কাজ আর কী হতে পারে! তাই সকলের কাছে আমাদের আবেদন, আপনারা এগিয়ে আসুন, স্বেচ্ছায় রক্তদান করুন। মনে রাখবেন, রক্তদান জীবন দান। আমাদের এই ছোট্ট উদ্যোগ যদি আরও মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করে, তাহলেই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে।”
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হবে, অতিথিরা ফিরে যাবেন নিজেদের বাড়িতে, থেমে যাবে উৎসবের ব্যস্ততা। কিন্তু রক্তদানের মাধ্যমে যে মানবিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ল, তার প্রভাব থেকে যাবে আরও অনেক দিন। চাপড়ার মাসুদ মণ্ডল ও সোহানা মণ্ডলের এই উদ্যোগ তাই শুধু অভিনব বউভাতের আয়োজন নয়, বরং নতুন জীবন শুরুর মুহূর্তে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অর্থবহ প্রকাশ। ব্যক্তিগত আনন্দের সঙ্গে মানবসেবাকে যুক্ত করার এই দৃষ্টান্ত আগামী দিনে আরও মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করে কি না, এখন সেটাই দেখার।
