উপাচার্য নিয়োগে আঞ্চলিকতার প্রভাব ও স্থানীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ— এ দুই প্রশ্নে অস্থির চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য করার প্রবণতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন নিয়োগকে ঘিরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। গত ২২ দিন ধরে কার্যত অচল রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এর মধ্যে গত সোমবার তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশের পর থেকে অবরুদ্ধ ছিলেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎবিহীন ভবনে আটকে থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন উপাচার্যসহ তার সঙ্গে ভেতরে অবস্থান করা বেশ কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর উপাচার্যকে উদ্ধার করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কারও কারও ধারণা, চুয়েটের আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এর আগে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে আন্দোলনের পেছনেও রাজনীতি ছিল বলে প্রকাশ পেয়েছিল। তবে চুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের কর্মসূচির সঙ্গে দলীয় রাজনীতির সম্পর্ক নেই। শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষায় তারা আন্দোলন করছেন।
নিয়োগ ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ : সূত্রমতে, চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের নিয়োগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবীণ বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এ ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির
খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই দুই নেতাই চট্টগ্রাম এবং রাউজানে অত্যন্ত প্রভাবশালী। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আল ফোরকানের নিয়োগে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ভূমিকা ছিল বলে সূত্র জানায়। চবির উপাচার্য অধ্যাপক আল ফোরকান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। চুয়েটে অবশ্য এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কেউ কেউ।
গত ২ আগস্ট সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ২৫ আগস্ট ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে চুয়েটের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান তিনি। ১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী। ওই অনুষ্ঠানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। এর আগে ২২ আগস্ট চুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ পরিদর্শন করেন অর্থমন্ত্রীর ছেলে ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ইসরাফিল খসরু।
এসব ঘটনা ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক রাজনৈতিক বলয় তৈরির আলোচনা রয়েছে। চুয়েট রাউজান এলাকায় অবস্থিত হলেও স্থানীয় বিএনপিপন্থিদের বড় অংশ নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেননি বলে ক্যাম্পাস-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। শুধু তার পক্ষে রয়েছেন চুয়েট শাখা ছাত্রদলের হাতেগোনা কয়েকজন নেতাকর্মী।
কুয়েট অধ্যায়ের টানাপড়েনে অধ্যাপক শরীফুল : নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের আগের কর্মস্থলের অভিজ্ঞতাও বর্তমান সংকটে আলোচনায় এসেছে। তিনি চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলে স্নাতক শেষে ইতালিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেন। পরে কুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন। চুয়েটে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ছিলেন।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর কুয়েটের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান শেখ শরীফুল আলম। তবে দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস ২১ দিনের মাথায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কুয়েটে আন্দোলনের মধ্যে উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব হারানো একজনকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ। তাদের মতে, আগের প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
উপাচার্য নিয়োগে আঞ্চলিকতার প্রভাব : চুয়েটের উপাচার্যদের তালিকা অনুযায়ী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার। এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মীর শহিদুল ইসলাম চুয়েটের উপাচার্য ছিলেন। ২০০৪ সালের ২৫ জুলাই দায়িত্ব নিয়ে তিনি ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত এ পদে ছিলেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চট্টগ্রামের বাসিন্দা। এরপর চুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরাই উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছেন। শেখ শরীফুল আলমসহ এ পর্যন্ত নয়জন শিক্ষক এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন স্থানীয় শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকার বাসিন্দা।
চুয়েট শিক্ষকদের ক্ষোভ : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুয়েটে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলী। ২০২৫ সালের ১ মে তাকে কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে শিক্ষক আন্দোলনের মুখে একই বছরের ২১ মে তিনি পদত্যাগ করেন।
চুয়েটের শিক্ষকের ভাষ্য, কুয়েটে বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন সেখানকার শিক্ষকদের একাংশ। এতে চুয়েটের শিক্ষকদের মধ্যে অপমানবোধ তৈরি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়েটের শিক্ষককে চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার পর যে আপত্তি তৈরি হয়েছে, তার পেছনেও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার প্রত্যাশা কাজ করতে পারে।
৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ : গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন থেকে সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পালন করছেন কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। এতে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। আন্দোলনের কারণে দায়িত্ব নেওয়ার পরও ক্যাম্পাসে যেতে পারছিলেন না নতুন উপাচার্য। সোমবার ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন তিনি। শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে উপাচার্য ভবনের ফটকে আবার তালা দেন। একই সঙ্গে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে উপাচার্যসহ ১০ থেকে ১১ জন ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম উপাচার্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যান।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান বলেন, প্রশাসন অবরুদ্ধ উপাচার্য নিয়ে গেছেন। আমাদের দাবি একটাই, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দিতে হবে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ বলেন, উপাচার্য এভাবে ক্যাম্পাসে আসবেন, তা তারা ভাবেননি। তাদের অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
দেশজুড়ে প্রতিবাদ : চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে চুয়েটের ঢাকাস্থ সাবেক শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এইউএসটি) শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তিও বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
