স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি। একই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীরা যাতে নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়ে দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলদারি ও অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে রাত ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা চলে বৈঠক। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। বৈঠকে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা, সরকারের কার্যক্রম, সংসদ পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
চিফ হুইপ বলেন, সংসদ সদস্যদের সমস্যার কথা শোনা এবং সেগুলোর সমাধানের পথ বের করতে প্রধানমন্ত্রী এ বৈঠকের উদ্যোগ নেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ সদস্যদের কথা শুনেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাও নিজ নিজ দায়িত্বের বিষয়ে কথা বলেছেন।
সরকারের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকারের কার্যক্রম মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, কোথাও সমস্যা থাকলে তা সংসদ নেতা ও মন্ত্রীদের জানাতে সংসদ সদস্যদের বলা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন—এমন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, কবে নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন সময় ও অন্যান্য কার্যক্রম নির্ধারণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দলীয় প্রতীক না থাকলেও বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করবে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই প্রতিটি ইউনিয়নসহ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। পরিস্থিতি অনুযায়ী দল সিদ্ধান্ত নেবে।
দুর্গাপূজায় নেতাকর্মীদের পাশে থাকার নির্দেশ
আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, পূজায় যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন কাজ করবে। পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যদেরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কেউ যাতে সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং তাঁদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বৈঠকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবাইকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে বলা হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করে পার পেয়ে যাবেন, এমন সুযোগ দল দেবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
সংসদ ও দলের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে সংসদ পরিচালনা, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এবং সংসদের বাইরে দলের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সেসব বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের করণীয় সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারের কার্যক্রম মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদ সদস্যদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সতর্কবার্তা দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চান। বৈঠকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েই আলোচনা হয়েছে।
৭ নভেম্বর পালনের প্রস্তুতি
বৈঠকে আগামী ৭ নভেম্বর পালনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ। দীর্ঘদিন পর দিনটি পালন করা হবে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার কথা জানান। তবে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা হয়নি
আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। কেউ ফিরে আসতে চাইলে আসতে পারেন, তবে এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সতর্ক সরকার
প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, এ বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়নি। তবে সরকার সচেতন রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকেরা যাতে জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়েন এবং নিরাপদে থাকতে পারেন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক। প্রয়োজন হলে তাঁদের সরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
