ইনানী ট্র্যাজেডির পর কাঠ গোলপাতার সুন্দরবন
কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতের নোনা বাতাসে শনিবার ভেসে এসেছে অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান শিখা আর পর্যটকদের করুণ আর্তনাদ। কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ মুহূর্তের অগ্নিকাণ্ডে কেড়ে নিয়েছে ১০টি তাজা প্রাণ।
কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতের নোনা বাতাসে শনিবার ভেসে এসেছে অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান শিখা আর পর্যটকদের করুণ আর্তনাদ। কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ মুহূর্তের অগ্নিকাণ্ডে কেড়ে নিয়েছে ১০টি তাজা প্রাণ। ছুটির আনন্দ নিমিষেই পরিণত হয়েছে কবরের নিস্তব্ধতায়। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল কক্সবাজারকেই স্তব্ধ করে নি, বরং পুরো দেশের পর্যটনখাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি আবারও জনসম্মুখে উন্মোচিত করে দিয়েছে। ইনানীর এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এখন এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য—সুন্দরবনের দ্বারপ্রান্তে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্পর্শ পেতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান খুলনার পশুর ও রূপসা নদীঘেঁষা ইকো-কটেজগুলোতে। কিন্তু প্রকৃতির সান্নিধ্য দেওয়ার নামে যেখানে গড়ে উঠেছে একের পর এক রিসোর্ট, সেখানে ওঁত পেতে রয়েছে কক্সবাজারের চেয়েও বড় কোনো অগ্নিকুণ্ডের মহাবিপর্যয়। ফায়ার লাইসেন্সহীন, অতি-দাহ্য পদার্থে তৈরি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট কি পরবর্তী কোনো ট্র্যাজেডির নীরব আয়োজন করছে?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের স্পর্শকাতর ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এবং বাফার জোনে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত পর্যটনের বিষবৃক্ষ। খুলনা জেলার দাকোপ ও কয়রা এবং পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলা সংলগ্ন নদীর পাড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি রিসোর্ট ও ইকো কটেজ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। এই ২৫টি রিসোর্টের মধ্যে কোনো ধরনের বৈধ ছাড়পত্র না থাকায় ইতোমধ্যে ২৩টি রিসোর্টের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সেগুলোর অবৈধ স্থাপনা অপসারণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পশুর নদী ও রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল সব আবাসন। পর্যটকদের প্রাকৃতিক অনুভূতি দিতে এসব কটেজ ও রিসোর্ট তৈরিতে পরিবেশগত ভারসাম্য ও সুরক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
সুন্দরবন অঞ্চলের রিসোর্টগুলোর মূল আকর্ষণই হলো সেগুলোর দেশীয় ও প্রাকৃতিক অবকাঠামো। তবে এই অবকাঠামোগত উপাদানই এখন রূপ নিয়েছে বড় ধরনের অগ্নিকুণ্ডের প্রধান উপাদানে।
ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত উল্লেখযোগ্য রিসোর্ট ও কটেজগুলোর মধ্যে রয়েছে: অরণ্য ছায়া, ইরাবতী ইকো রিসোর্ট, বনলতা ইকো কটেজ, ম্যানগ্রোভ হ্যাভেন রিসোর্ট, জঙ্গলবাড়ি সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট, বনবাস ইকো ভিলেজ, বনমালী ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট, বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট, সুন্দরী ইকো রিসোর্ট ও গোলকানন ইকো রিসোর্ট । এই কটেজগুলোর প্রায় শতভাগই নির্মিত হয়েছে শুকনা কাঠ, বাঁশ, গোলপাতা ও ছনের মতো অতি দাহ্য পদার্থ দিয়ে। এর সাথে পর্যটকদের আধুনিক নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে যুক্ত করা হয়েছে রান্নার এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার, হাই-ভোল্টেজ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং দুর্বল বৈদ্যুতিক ওয়ারিং।
প্রাকৃতিক দাহ্য পদার্থের সাথে উচ্চ মাত্রার বৈদ্যুতিক চাপ ও গ্যাস সিলিন্ডারের সংমিশ্রণ প্রতিটি কটেজকে এক একটি জ্বলন্ত বোমায় পরিণত করেছে। সামান্য একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা রান্নাঘরের আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকেই এই শুকনা গোলপাতা ও কাঠের ঘরে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইনানীর ‘টুপটুপ রিসোর্ট’ কাঠ দিয়ে তৈরির কারণে যেভাবে মিনিটেই ছাই হয়ে গেছে, ঠিক একই দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার সব উপকরণ মজুদ রয়েছে সুন্দরবনের এই কটেজগুলোতে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যমান আইন ও অগ্নিনির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো বাণিজ্যিক আবাসন, হোটেল বা রিসোর্ট পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিস থেকে বৈধ ফায়ার লাইসেন্স গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পর্যটকদের দ্রুত বের হওয়ার জরুরি নির্গমন পথ (ঊসবৎমবহপু ঊীরঃ), নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার পানির জলাধার এবং অগ্নিনিরোধক নকশা থাকা আবশ্যক।
অথচ বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ২৪টি ইকো-রিসোর্টের একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই। গত কয়েক বছর ধরে ফায়ার সার্ভিসের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং কোনো প্রকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই এসব প্রতিষ্ঠান অবাধে পর্যটকদের আবাসন ও থাকা-খাওয়ার সেবা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম নিরাপত্তা অবকাঠামোও তৈরি করেনি এসব রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদারকির অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক শিথিলতার কারণেই এই অবৈধ ব্যবসার ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে।
অগ্নিঝুঁকি ও লাইসেন্সহীন ব্যবসার বিষয়ে জানতে চাইলে দায় এড়ানোর সুর ফুটে ওঠে সুন্দরবন ইকো-রিসোর্ট মালিক সমিতির প্রতিনিধির কথায়। সমিতির এক প্রতিনিধি জানান, "আমরা ব্যবসা অবৈধভাবে চালাতে চাইনি। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে অনুমোদনের জন্য একাধিকবার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ফায়ার লাইসেন্স এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স না থাকায় শেষ পর্যন্ত আমরা চূড়ান্ত অফিশিয়াল অনুমোদন পাইনি।"
চূড়ান্ত অনুমোদন না পেয়েও কীভাবে পর্যটকদের সেখানে রাখা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, "আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন নই। ফায়ার লাইসেন্স না থাকলেও আমরা আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিটি ঘরে ও কটেজ প্রাঙ্গণে বালু ভর্তি বালতি এবং অগ্নিনির্বাপণ গ্যাস সিলিন্ডার ঝুলিয়ে রেখেছি।"
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠ, বাঁশ আর গোলপাতার কটেজে ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা কয়েক বালতি বালু একেবারেই অপ্রতুল। একবার গোলপাতার চালে আগুন লাগলে তা নেভাতে দরকার বিপুল পরিমাণ পানির উচ্চচাপ, যা এই সাধারণ বালু বা ছোট সিলিন্ডার দিয়ে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
সুন্দরবনের চারপাশের রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো এর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। খুলনা শহর বা মোংলা সদর থেকে দাকোপ, কয়রা ও সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ রিসোর্টগুলোর দূরত্ব অনেক বেশি এবং যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নদীপথ।
খুলনা বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মাসুদ সরদার এই মারাত্মক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, "কক্সবাজারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আমরা সুন্দরবনের আশপাশের রিসোর্টগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছি। আমরা তদারকি করে দেখেছি, সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা এসব পর্যটন কেন্দ্রের একটারও ফায়ার লাইসেন্স নেই।" তিনি আরও যোগ করেন, "সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় হলো এদের দুর্গম অবস্থান। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে যদি কোনো বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে ফায়ার সার্ভিসের ভারী গাড়ি বা উদ্ধারকারী দলের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো একদম অসম্ভব। নদী পার হয়ে বা সরু কাঁচা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পুরো এলাকা ভস্মীভূত হয়ে যাবে। তাই আমরা এখনই স্থানীয় প্রশাসনকে এই অবৈধ ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।"
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা এবং খুলনার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের অগ্নিকাণ্ডকে সুন্দরবনের জন্য শেষ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, সুন্দরবনের পরিবেশ কেবল পর্যটকদের আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেই নেই, বরং একটি রিসোর্টের বিশাল আগুন পুরো ম্যানগ্রোভ বনে ছড়িয়ে পড়লে বন্যপ্রাণী ও সার্বিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে।
পরিবেশবাদিকর্মীরা জানান, বিশ্ব ঐতিহ্যের এই অংশটিতে ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্স ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে পর্যটকদের আবাসন দেওয়া একেবারেই বেআইনি। ফায়ার লাইসেন্সহীন ও কাঠ-ছনের তৈরি এই রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের রাত যাপন করতে দেওয়া মানে তাদের জীবন নিয়ে এক ধরনের ছিনিমিনি খেলা। যদি প্রশাসন অবিলম্বে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অবৈধ রিসোর্ট অপসারণ না করে এবং বাকিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে সুন্দরবনেও যেকোনো সময় কক্সবাজারের মতো পর্যটকদের পোড়া লাশ আর লাশের মিছিল দেখতে হতে পারে।
কক্সবাজারের ইনানীতে ১০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের পর্যটন শিল্পের সুরক্ষার একটি বড় ক্ষতচিহ্ন একে দিয়েছে। সেই রক্তের দাগ না শুকাতেই যদি সুন্দরবনের বেআইনি রিসোর্টগুলোর ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে পরবর্তী দুর্যোগের দায় প্রশাসন এড়াতে পারবে না।
পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের জীবন নিরাপদ রাখতে অবৈধ ইকো-কটেজগুলোর কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। কেবল পর্যটন ব্যবসাকে উৎসাহিত করলেই চলবে না, তার সাথে জীবন রক্ষাকারী ফায়ার নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন করাও আবশ্যক। তা না হলে সুন্দরবনের সবুজ শ্যামল মায়ায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের ছুটির আনন্দ নিমেষেই বিষাদে পরিণত হবে।
