প্রথম দফায় পিটুনির পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ৷ রাতে সেখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করা হয়৷ অবস্থার অবনতি হলে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান৷
ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শামীমকে মারধরের খবর পেয়ে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পুলিশ৷ রাত ৮টা ৪০ মিনিটে একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার মারধর করেন৷ পরে সাতক্ষীরায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়৷ নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা৷
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যার সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যার্স (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷ পরে কারখানা থেকে এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷
এরপর গত ১১ এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমকে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷
ওয়াহিদুজ্জামান শামীম হত্যা সম্পর্কে যা জানা গেছে
জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অডিও কথোপকথনকে কেন্দ্র করে৷ স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, শামীমের কয়েকটি অডিও কথোপকথন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেসব কথোপকথনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন৷ এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে৷
তবে শামীমের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে শামীম অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন৷ তাদের ভাষ্য, শামীম মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না৷ কয়েক দিন আগে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন৷
দীপু চন্দ্র দাস হত্যায় বিচার চান স্থানীয়রা
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর করছেন—এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ৷ পরে তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়৷ স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, শামীম ধর্ম অবমাননা করেছেন৷
ওসি আরো বলেন, রাত ৮টা ৪০ মিনিটে দুই থেকে আড়াই শ লোক হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে চিকিৎসা দিতে বাধা দেন৷ পুলিশ, আনসার সদস্য ও চিকিৎসকেরা বাধা দিলেও তাঁরা শোনেননি৷ একপর্যায়ে পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়৷ পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে৷
আজ বুধবার সকালে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রথম দফায় মারধরের পর শামীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল৷ রাতে শতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে এসে অন্য রোগীদের সামনে ওয়ার্ডের ভেতরে তাকে মারধর করেন৷ একপর্যায়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়৷ এতে অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়৷ সেখানে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়৷
কয়েকটি ভিডিও ও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থার আশ্বাস
এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে৷ একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শামীম মাটিতে পড়ে আছেন৷ তাকে ঘিরে অনেক মানুষ ভিড় করেছেন৷ কয়েকজন মুঠোফোনে ভিডিও করছেন৷
আরেকটি ভিডিওতে রাতে দেবহাটা উপজেলা সদরে একদল মানুষকে মিছিল করে শামীমের শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে দেখা যায়৷ মিছিল থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়৷ ভিডিওতে লোকজনকে শামীম যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, সেখানে যাওয়ার আহ্বান জানাতেও শোনা যায়৷
এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷''
এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো, ডয়চে ভেলে)
