জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় এপিসির (সাঁজোয়া যান) চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করা হয়েছিল উবারচালক মোখলেসুর রহমানকে (দুর্জয়)। আওয়ামী লীগের লোকজনের সহযোগিতায় পুলিশ সদস্যরা দুর্জয়ের লাশ গুম করার চেষ্টা করেন। তুরাগ নদে তাঁর লাশ ফেলে দেওয়া হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ২৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এই মামলার আসামিদের মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার আছেন। রোববার তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা উপস্থিত আসামিদের ট্রাইব্যুনাল বাংলায় পড়ে শোনান।
তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরায় আসামিরা এপিসির পেছনের চাকায় পিষ্ট করে উবারচালক মোখলেসুর রহমানকে হত্যা করেন। তাঁর লাশ গুম করার জন্য পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের সহায়তায় মরদেহ প্রথমে উত্তরা পূর্ব থানা ভবনের নিচতলায় পানির পাম্পের ঘরে রাখেন। পরে সে রাতে তাঁর লাশ উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের আইচি হাসপাতালের সামনের তুরাগ নদে ফেলে দেন। ২০ জুলাই টঙ্গীর মরকুন গুদারাঘাটের মারুকা সেতুর উত্তর পাশে মরকুন বিলে মোখলেসুর রহমানের লাশ ভাসমান অবস্থায় পায় টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
আসামিদের বিরুদ্ধে আনা আরও অভিযোগ তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের এমবিএ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হন। সে সময় মুগ্ধ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে সহযোগিতার পাশাপাশি আন্দোলনরত ছাত্র–জনতাকে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন। পরে মুগ্ধকে আন্দোলনকারীরা উত্তরার একটি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে মোট চারটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সব কটি অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগের মধ্যে আছে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরায় মুগ্ধ, মোখলেসুর রহমানসহ জাহিদুজ্জামান তানভীন, শেখ ফাহমিন জাফর, মো. শাকিল হোসেন, মো. সাব্বির হোসেন ও সজিব সরকারকে গুলি করে হত্যা। এ ছাড়া পরদিন ১৯ জুলাই উত্তরা এলাকায় রিদোয়ান শরীফ, মো. ছাব্বির ইসলাম, মো. আসাদুল্লাহ ও নাঈমা সুলতানাকে আসামিরা গুলি করে হত্যা করেন বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
উপস্থিত আসামিদের কাছে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, তাঁদের বিরুদ্ধে পঠিত অভিযোগ স্বীকার করেন কি না। জবাবে উপস্থিত আসামিরা বলেন, তাঁরা নির্দোষ। তাঁরা ন্যায়বিচার চান।
তারপর এই মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলার যে আট আসামি গ্রেপ্তার আছেন তাঁরা হলেন সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান, সাবেক কনস্টেবল হোসেন আলী, উত্তরা পশ্চিম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগী দেলোয়ার হোসেন, মো. শাহ আলম ও মো. ইরফানুল হক গাজী।
এই মামলার অন্য ১৮ জন আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপি উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীম, সাবেক এডিসি তৌহিদুল ইসলাম, সাবেক এসি সুমন কর, উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি বি এম ফরমান আলী প্রমুখ।
