থাইল্যান্ডের স্টলের সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া কাইজার
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ৭৮তম আন্তর্জাতিক বইমেলা বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক, অনুবাদক ও পাঠকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বইমেলায় নতুন বইয়ের পরিচিতি, লেখক-পাঠক মতবিনিময়, সাহিত্য পাঠ, পেশাগত আলোচনা এবং সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
৭ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান এবারের বইমেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা সংস্থা, সাহিত্য সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনের বহুমাত্রিকতাকে তুলে ধরেছে।
আরও পড়ুন
বইমেলার আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের আসরে প্রায় ৪ হাজার প্রদর্শক অংশ নিচ্ছেন। মেলার মাঠ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরজুড়ে নির্ধারিত আয়োজনের সংখ্যা ৩ হাজার ৮০০-এর বেশি।
৭ ও ৮ অক্টোবরের প্রথম দুই পেশাগত দিনে ১৩০টি দেশ থেকে মোট ৬৫ হাজার বাণিজ্যিক ও পেশাগত দর্শনার্থী অংশ নিয়েছেন। ফলে সপ্তাহান্তে সাধারণ পাঠকদের জন্য মেলা উন্মুক্ত হওয়ার পর দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
তবে শনিবারের দর্শনার্থীর মোট সংখ্যা সম্পর্কে মেলার আয়োজকদের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশিত না হওয়ায় নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
শনিবারের জন্য প্রকাশিত অনুষ্ঠানসূচিতে জনপ্রিয় লেখক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ এবং দিনব্যাপী নানা আয়োজনের চিত্র পাওয়া যায়।
এবারের বইমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চেকিয়া বা চেক প্রজাতন্ত্রের সম্মানিত অতিথি দেশ হিসেবে অংশগ্রহণ। ‘চেকিয়া: এ কান্ট্রি অন দ্য কোস্ট’ প্রতিপাদ্যে দেশটি তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও সৃজনশীলতার পরিচয় তুলে ধরছে।
চেকিয়ার ৭৫ জন লেখকের অংশগ্রহণে আয়োজিত হয়েছে বিভিন্ন পাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রায় ২ হাজার ৩০০ বর্গমিটার আয়তনের অতিথি দেশের প্যাভিলিয়নে রয়েছে ব্যতিক্রমী নকশা, কল্পনানির্ভর শিল্পকর্ম এবং প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থাপনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সাহিত্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন এবং রোবটের মাধ্যমে সরাসরি কমিকস আঁকার মতো আয়োজন এবারের মেলায় প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সম্পর্ককে বিশেষভাবে সামনে এনেছে।
শনিবারের উল্লেখযোগ্য আয়োজনগুলোর মধ্যে ছিল- সাহিত্য পাঠ, বই নিয়ে আলোচনা, লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের সাক্ষাৎ এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান।
হল ৩.০-এর হেসে রাজ্যের ‘লিটারাতুর ইন হেসেন’ স্ট্যান্ডে দুপুর ১২টায় লেখক ক্রিস্টিনে কোশমিডার তার ‘আইন হাউস ফ্যুর মিশ’ বই নিয়ে আলোচনা করেন।
দুপুর সাড়ে ১২টায় লুডগার ফিটকাউট উপস্থাপন করেন ‘ল্যুডার্স লিস্ট’ গ্রন্থ, যেখানে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে জার্মান রাজনীতিক ও নারী অধিকারকর্মী মারি-এলিজাবেথ ল্যুডার্সের ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
বিকেল ৩টায় ‘জনি কেয়ার লেজেন’ শিরোনামে সাহিত্য সাময়িকী ‘জনি’র অতীত ও বর্তমান নিয়ে বিশেষ আয়োজন ছিল।
হল ৩.১-এর লাতিন আমেরিকাবিষয়ক মঞ্চেও ছিল উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘কমিক অ্যান্ড হিউমার’ আলোচনায় অংশ নেন চিলির লেখক ও কমিকস শিল্পী আলবার্তো মন্ত।
আলোচনায় লাতিন আমেরিকার কমিকস, হাস্যরস ও চিত্রভিত্তিক গল্প বলার ধারা স্থান পায়।
একই সঙ্গে হল ৩.০-এর স্বাধীন প্রকাশকদের পাঠমঞ্চে যুদ্ধ, সামরিকীকরণ ও সমকালীন সমাজে শান্তিবাদী অবস্থানের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সাহিত্য যে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝারও একটি শক্তিশালী উপায়- এসব আয়োজন তারই প্রতিফলন।
হল ৩.০-এর এইচ১০৫ নম্বর স্থানে দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘বুখারহার্বস্ট’ শীর্ষক সাহিত্য আলোচনা। এতে শিদা বাজিয়ার, ম্যাক্স চোলেক, পাউলা ফ্যুরস্টেনবার্গ, মারিকে রাইমান, কার্স্টিন প্রেউসভিশ ও ইসাবেল শায়ানির মতো লেখক ও আলোচকেরা তাদের বই এবং সমকালীন সমাজের বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেন।
অন্যদিকে হল ৫.০-এর ডিসকভারি স্টেজে সকালে মহাকাশ প্রকৌশলী মিখায়েলা বেন্টহাউস তার অভিজ্ঞতা ও বই নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। এ ধরনের অনুষ্ঠান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আত্মজীবনী এবং সাহিত্যকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার বিশেষত্ব হলো, এখানে একই সঙ্গে বইয়ের বাণিজ্যিক অধিকার, অনুবাদ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সহযোগিতা এবং নতুন পাঠক তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ডিজিটাল প্রকাশনা, অডিওবুক, বই থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তরুণ প্রজন্মের প্রকাশনা পেশায় প্রবেশের সুযোগ নিয়েও এবারের মেলায় আলোচনা হয়েছে।
শনিবার তরুণ পেশাজীবীদের জন্য ‘ইয়ং প্রফেশনালস ডে’ আয়োজনের অংশ হিসেবে হল ৪.১-এর ইনোভেশন স্টেজে বিকেল ২টা থেকে বিশেষ কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। এসব উদ্যোগ প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে।
মেলার সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও ছিল নানা আকর্ষণ। জনপ্রিয় লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বইয়ে স্বাক্ষর নেওয়া, নতুন প্রকাশনা দেখা এবং বিভিন্ন দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাঠকদের কাছে বিশেষ আবেদন তৈরি করেছে।
এআরডি, জেডডিএফ ও ৩ স্যাটের সাহিত্য মঞ্চে নতুন বই ও সমকালীন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং কংগ্রেস সেন্টারের হারমোনি হলে অডিওবুকভিত্তিক অনুষ্ঠান ছিল দিনের উল্লেখযোগ্য আকর্ষণগুলোর মধ্যে।
ফলে বইমেলা শুধু প্রকাশকদের বাণিজ্যিক মিলনস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে পাঠক, লেখক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের সম্মিলিত উৎসবে।
আগামী বছরের বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ৬ থেকে ১০ অক্টোবর- এমন তারিখ আয়োজকদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এখানে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে ২০২৭ সালের সম্মানিত অতিথি দেশ হিসেবে চিলির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। চিলির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রকাশনাকে ঘিরে পরবর্তী আসরেও আন্তর্জাতিক পাঠক ও প্রকাশকদের আগ্রহ থাকবে বলে আশা করা যায়।
সব মিলিয়ে, ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার এবারের আয়োজন বিশ্বসাহিত্য, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমকালীন সমাজের নানা প্রশ্নকে একই পরিসরে যুক্ত করেছে।
শনিবারের অনুষ্ঠানগুলোতে সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি যুদ্ধ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, তরুণদের কর্মজীবন এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
বইয়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে সংযোগ তৈরি করা এবং ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানো- ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার এই ঐতিহ্য এবারের আয়োজনেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
অমিয়/
