গোটা রাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি ও ফার্মাসি কোর্সে গত বছরের তুলনায় ৭৫.৪ শতাংশ বেশি ভর্তি হয়েছে বলে দাবি করেছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। এরই বিপরীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, গত ৫ বছরে এই প্রথম সেখানে বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ের পরেও সব আসন ভর্তি হয়নি।
তা হলে হিসাবের গরমিল কোথায়? শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, গোটা বিষয়ে কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে।
সূত্রের খবর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি আসন রয়েছে। এ বার প্রায় ১৮৯টি আসন ফাঁকা। এর মধ্যে অসংরক্ষিত আসন প্রায় ৬০টি। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া (ইডব্লিউএস) পড়ুয়াদের জন্য ৫৯টি এবং বাকি ৭০টি সংরক্ষিত আসনেও এ বারে কেউ ভর্তি হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, প্রতিটি বিভাগে মোট আসনের ভিত্তিতে ইডব্লিউএস আসন সংরক্ষিত থাকে। ফলে কোনও বারই ওই আসন সম্পূর্ণ ভর্তি হয় না। কিন্তু বাকি প্রায় ১১৯১ আসনে প্রতি বছরই ভর্তি হয়ে যায়। অসংরক্ষিত আসন কোনও বছরেই ফাঁকা পড়ে থাকে না। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে চর্চা। কিন্তু কেন হল এমন অবস্থা? এ বছরে নতুন ভাবে বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে এক আধিকারিক জানান, বিগত বছরগুলিতে জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ভাবে ভর্তির পরে বিকেন্দ্রীভূত বা ‘ডিসেন্ট্রালাইজ়় স্পট অ্যাডমিশন’-এর মাধ্যমে ভর্তি করানো হত। সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ুয়ারা ভর্তি হতে পারতেন। কোনও বারই কেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ের পরে যাদবপুরের আসন পূর্ণ হত না। কিন্তু ‘ডিসেন্ট্রালাইজ়় স্পট অ্যাডমিশন’–এর পরে ইডব্লিউএস ছাড়া বাকি সব আসন পূর্ণ হত বলে দাবি এক আধিকারিকের। কিন্তু এ বার ‘কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং ‘ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন’ ছাড়া সব বিভাগেই কিছু শূন্য পদ পড়ে কয়েছে। যা যাদবপুরের চিত্রের সঙ্গে বেমানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য এক অফিসারের দাবি, কোনও পড়ুয়া গত বছর কেন্দ্রীয় ভাবে এক বিভাগে ভর্তি হলেও যখন স্পট অ্যাডমিশনে বিভাগ পরিবর্তন করেছেন তখন তাঁর পরের স্থানাধিকারী পড়ুয়া তাঁর ছেড়ে আসা বিভাগে ভর্তি হতে পেরেছেন। কিন্তু এ বারে বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ের সময়ে একাধিক রাউন্ড হওয়ায় যাদবপুরে ওই ফাঁকা পড়ে থাকা আসনে অন্য কাউকে ভর্তি করানো যায়নি। এই স্পট অ্যাডমিশন না হওয়াটাকেই আসন ফাঁকা পড়ে থাকার জন্য দায়ী করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
যদিও জয়েন্ট এন্ট্রার্স বোর্ডের তরফে এক আধিকারিক জানান, প্রথমে ঠিক হয়েছিল কেন্দ্রীয় ভাবে যাঁরা ভর্তি হয়ে গিয়েছেন তাঁরা আর কেউ বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ে সুযোগ পাবেন না। কারণ ইতিমধ্যে তাঁরা তিন বার বিষয় ও প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু পরে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে আপত্তি ওঠায় পিছু হটতে বাধ্য হয় বোর্ড। ফের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পুরনো নিয়ম প্রত্যাহার করে বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ে সকলকে ফের সুযোগ দেওয়া হয়। একাধিক রাউন্ডে ভর্তি হয়। কিন্তু তার পরও যাদবপুরের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের আনা যায়নি তা সত্যিই বিপজ্জনক, নাকি পদ্ধতিগত ত্রুটি— তা নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায় ৪৪০টি আসনের মধ্যে প্রায় ১০০-র বেশি আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। অন্য কোনও বছর এই চিত্র হয় না বলেই দাবি। তবে এ বারে নতুন ভাবে যে বিষয় চালু হয়েছে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ভিএলএসআই ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি) সেখানে ৩০টি আসনের মধ্যে ২৬ জন ভর্তি হয়েছে। কিন্তু রোবোটিক্সের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভর্তির প্রবণতকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ফল হয়েছে উল্টো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের দাবি এমনও দেখা গিয়েছে যে কোনও পড়ুয়া একটি বিভাগ ছেড়ে অন্য বিভাগে ভর্তি হলেও পুরনো বিভাগের ফাঁকা আসন বোঝা যাচ্ছিল না। ফলে ওই একজন পড়ুয়ার ভর্তি দু’বার দেখাচ্ছিল এবং নতুন কেউ ভর্তি ও হতে পারছিল না। ফলে গোটা সিস্টেম নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘২০০৯ সালে যে ভাবে জয়েন্ট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় ভাবে ‘স্পট অ্যাডমিশন’ করানো হত সেই ব্যবস্থা ফিরে আসুক। না হলে এ ভাবে আসন ফাঁকা পড়ে থাকবে অথচ পড়ুয়ারা চাইলেও ভর্তি হতে পারবে না।’’
তবে জয়েন্ট বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে, কোনও বিষয়ে পড়ুয়াদের আগ্রহ কম থাকলে সেটা কিছু করার নেই। তবে তাঁরাও চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ভাবে বিকেন্দ্রীভূত কাউন্সেলিংয়ে শুধু নতুনরাই সুযোগ পান। কিন্তু সেই ব্যবস্থা করা যায়নি। ফলে ওই শূন্য আসন নিয়েই চলতে হবে রাজ্যের অন্যতম ও প্রাচীন দুই বিশ্ববিদ্যালয়কে।
