স্বাধীন সাংবাদিকতা, তথ্য ও মতপ্রকাশের সুরক্ষায় ১২ দফা সুপারিশ
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ মতামত, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি ও রাজনৈতিক সমালোচনার কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত না করার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ।
জার্নাল ডেস্কপ্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ মতামত, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি ও রাজনৈতিক সমালোচনার কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত না করার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তে প্রবেশের আগে আদালতের অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা জামিনযোগ্য করার প্রস্তাব দিয়ে আইনটি পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে দেওয়া ১২ দফা সুপারিশে এসব প্রস্তাব করেছে সম্পাদক পরিষদ। রোববার (১৮ অক্টোবর) এক বিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশগুলোর কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, আইনের কাঠামোতে একদিকে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অন্যদিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, বৈধ মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতার সুস্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক পরিষদ মনে করে, প্রস্তাবিত আইন এমন একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, প্রকৃত অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে। একই সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পরিসর সুরক্ষিত করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল পরিসরে সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে এসব বিষয়ের মধ্যকার প্রয়োজনীয় সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নয়, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সম্পাদক পরিষদের সুপারিশগুলো হলো ১. জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, বিশ্লেষণ, মতামত, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি ও রাজনৈতিক সমালোচনার কারণে কাউকে অপরাধী করা যাবে না। মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট অপরাধ জামিনযোগ্য করতে হবে। ২. সাংবাদিকের পেশাগত কাজ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি ও ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তে প্রবেশের আগে আদালতের অনুমোদন নিতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক পর্যালোচনা করতে হবে। ৩. ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা দিতে হবে। অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত তথ্যকে এককভাবে অপরাধের উপাদান করা যাবে না। বুলিং, মানহানি, যৌন হয়রানি, সেক্সটর্শনসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধেরও স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকতে হবে। ৪. দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দ বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিতে হবে। ৬. সংবাদ বা ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ, আপিলের সুযোগ এবং বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পর্যালোচনা এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ৭. অনলাইন মানহানিকে নতুন ও কঠোর সাইবার অপরাধ না বানিয়ে বিদ্যমান কাঠামোয় প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি ও সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করা যাবে না। ৯. কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল বা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তি দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। ১০. সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সূত্রের পরিচয় প্রকাশে সাংবাদিককে বাধ্য করা যাবে না। ১১. সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট পেশাগত অভিযোগে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রেস কাউন্সিলের অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকেও এর আওতায় আনতে হবে। ১২. কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তদন্ত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার ওপর স্বাধীন তদারকি, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
