আঠারো বছর আগে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর উত্তরাঞ্চলের মানুষের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে বিভাগ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রমের পরিসর। গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পূর্তিতেও আবাসন সংকট, শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম ও অবকাঠামগত সংকটে জর্জরিত উত্তরের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ২২টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৭৫ একরের সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসে রয়েছে চারটি একাডেমিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও ছেলেদের দুটি ও মেয়েদের একটি সহ মোট তিনটি আবাসিক হল। উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শিক্ষার পরিসর বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এখনও চরমে।
আবাসনের বাইরে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী
প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে আসন রয়েছে মাত্র ৮২৪টি। অর্থাৎ, আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি ৯০ শতাংশকে থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসের বাইরের মেস ও ভাড়া বাসায়। আসনসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের বাড়তি বাসাভাড়া ও খাবারের খরচ বহন করতে হচ্ছে। দেশের দূরবর্তী জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এ ব্যয় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করা সহ নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যায়।
শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষক সংকটে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২০৪ জন। অর্থাৎ প্রতি ৪০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। অথচ ইউজিসির শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ২০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা রয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককেই গড়ে ৮ থেকে ১০টি কোর্স নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ক্লাস-পরীক্ষার চাপে গবেষণা কার্যক্রমে যথেষ্ট সময় দিতেন পারছেন না শিক্ষকরা।
প্রায় ৯ হাজার মানুষের চিকিৎসায় চার চিকিৎসক
আবাসনের পর বড় উদ্বেগ চিকিৎসাসেবা। প্রায় ৯ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক মাত্র চারজন এবং নার্স একজন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন সেখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। মেডিকেল সেন্টারে ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসাসেবা, আবাসিক ব্যবস্থা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। সেবাকেন্দ্রটি নির্দিষ্ট সময় খোলা থাকায় সন্ধ্যা বা রাতে অসুস্থ হলে শিক্ষার্থীদের বাইরে চিকিৎসা নিতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি সেবা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং নারী শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
অডিটরিয়ামের অপেক্ষায় ১৮ বছর
বড় পরিসরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, সম্মেলন কিংবা অন্যান্য আয়োজনের জন্য স্বতন্ত্র অডিটরিয়ামের খুবই প্রয়োজন তবে প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরেও একটি অডিটোরিয়ামের অপেক্ষায় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি আজও। ফলে শহীদ দের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে অস্থায়ীভাবেই ব্যবস্থা নিতে হয়।
গবেষণায় সম্ভাবনা
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গবেষণায় সম্ভাবনা দেখাচ্ছে বেরোবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ের বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি উদ্ভাবনী গবেষণা প্রকল্প অংশ নেয়। এসব অর্জন গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ, আধুনিক পরীক্ষাগার, গবেষণার উপকরণ ও সহযোগিতা। গবেষণালব্ধ জ্ঞান স্থানীয় সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অবদানও বাড়বে।
আবু সাঈদের স্মৃতি, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
বেরোবির ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এই বিশ্ববিদ্যালকে নতুন করে পরিচয় করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা তার স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি শহিদের রক্তে ভেজা এই শিক্ষাঙ্গনে ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা , শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারে।
শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি-ব্রাকসু
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু)। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন মানববন্ধন,সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান এবং সর্বশেষ আমরণ অনশনের পর ব্রাকসুর তফসিল কয়েকবার ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টালবাহানায় আর নানান জটিলতায় আলোর মুখ দেখেনি শিক্ষার্থীদের বহুল প্রতীক্ষিত এই প্লাটফর্ম। অন্যদিকে রাজনীতি নিষিদ্ধ স্বত্ত্বেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি ঘিরে উঠেছে প্রশ্ন। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ মারামারিসহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ব্যঘাত ঘটেছে।
প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পূর্তিতে বেরোবির সামনে তাই দুটি বাস্তবতা হাতছানি দিচ্ছে। একদিকে বিস্তৃত শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণার সম্ভাবনা, অন্যদিকে আবাসন, চিকিৎসা ও অবকাঠামোর ঘাটতি। এসব সংকট নিরসনে পরিকল্পনার পাশাপাশি দৃশ্যমান বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরাঞ্চলের মানুষের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা নির্ভর করছে শিক্ষার মানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান কতটা কমানো যায় সেই হিসাব নিকাশের ওপর।
রিপন শাহরিয়ার/এএমকে
