গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে অস্ত্রকাণ্ডে আলোচনা-সমালোচনার মুখে গতকাল প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এ ঘটনায় আলোচনায় সামনে এসেছে রাজধানীর ঢাকার মাদকবিরোধী অভিযান ও এলাকাভিত্তিক মাদক কারবারিদের অপতৎপরতার দিকটি। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপূজার পর ঢাকার মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৮ অপরাধ বিভাগের ৫০ থানা এলাকার ৫১৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারির একটি হালনাগাদ ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র বলেছে, তালিকায় থাকা মাদক কারবারিদের সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করে অভিযান চালানো হবে না। তালিকাভুক্ত এই ৫১৩ শীর্ষ মাদক কারবারির কে কারাগারে আছেন, কে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার মাদক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন, কে পলাতক কিংবা কারা নতুন করে অপরাধে জড়িয়েছেন— এসব তথ্য যাচাই করা হবে। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের সহযোগী, তাদের পরিচালিত চক্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাজনৈতিক মহলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণের পর বিশেষ অভিযানে নামবে ডিএমপির ৫০ থানা পুলিশ। এই অভিযানে যুক্ত করা হবে গোয়েন্দা পুলিশকেও। ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এই অভিযান পরিচালিত হবে। এ ছাড়া মাদকপ্রবণ এলাকায় ব্লকরেইডও দেওয়া হবে। অভিযানে পুলিশের কোনো সদস্যের মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধের মাত্রানুযায়ী বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার
(ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে
থাকে। এক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রতিনিয়ত মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপির আট অপরাধ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীর্ষ মাদক কারবারির সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে মিরপুর বিভাগ। এ বিভাগের সাত থানায় তালিকাভুক্ত রয়েছেন ১০১ জন। এর পর মতিঝিল বিভাগের সাত থানায় ৭০ জন, ওয়ারী বিভাগের সাত থানায় ৬০, রমনা বিভাগের ছয় থানায় ৫৮, লালবাগ বিভাগের পাঁচ থানায় ৫৮, তেজগাঁও বিভাগের পাঁচ থানায় ৫৭, গুলশান বিভাগের ছয় থানায় ৫৭ এবং উত্তরা বিভাগের ছয় থানায় ৫২ জন। তালিকাভুক্তদের কেউ কারাগারে, কেউ জামিনে এসে ফের মাদকের কারবারে যুক্ত হয়েছে।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে পুলিশ, এসআরবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ডিএমপির ৫০ থানায় ৪ হাজার ৪৯৫টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬ হাজার ৪৫৮ জনকে। অন্যদিকে গত ৯ মাসে ডিএমপির ৫০ থানাসহ সব বিভাগ মিলে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ৩ হাজার ২৫টি মামলা করেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে ৪ হাজার ৬৮০ জন মাদক কারবারিকে।
গত ৯ মাসে ডিএমপি ৬ হাজার ২৯৪ কেজি গাঁজা, ১৯ কেজি হেরোইন, ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৭ হাজার ৫৫৭ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে। অন্যদিকে ডিএমপিসহ অন্য সব ইউনিট মিলে গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৭ হাজার ৭১৮ কেজি গাঁজা, ২৭ লাখ ৭৩৪ হাজার ৩৯০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ৯ হাজার ২৮৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে।
জানা গেছে, দুর্গাপূজার পর মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনসম্মত নজরদারি, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, মাদক উদ্ধার এবং মাদক মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হবে।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে। আবার কারও বিরুদ্ধে এক দশকের বেশি সময় ধরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়ে আসছে। তাদের কয়েকজন জামিনে বেরিয়ে কিংবা আত্মগোপনে থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। যারা বারবার গ্রেপ্তার হচ্ছেন, আবার কিছুদিন পর জামিনে মুক্ত হয়ে মাদক কারবারে যুক্ত হচ্ছেন, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাদের আটকাদেশ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে মাদকের বেশি মামলা রয়েছে।
পুলিশের তালিকায় মামলার সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন ভাটারার রাজু আহমেদ। তার বিরুদ্ধে ৪৭টি মামলা রয়েছে। ভাসানটেকের মো. রূপচানের বিরুদ্ধে মামলা ৪৩টি। শাহজাহানপুরের ‘কানা সোহেল’ নামে পরিচিত মো. সোহেলের বিরুদ্ধে মতিঝিল ও শাহজাহানপুর থানায় ২৭টি মামলা রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এসব মামলা হয়। বর্তমানে তিনি পলাতক। মুগদার মো. লালনের বিরুদ্ধে ২২টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ জুন মাসে পল্টন থানায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ানের খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। গত ১১ মার্চ খিলগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয়।
তালিকায় থাকা অন্যদের মধ্যে খিলগাঁওয়ের মাইন উদ্দিনের বিরুদ্ধে ১৪টি, সবুজবাগের নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে ১৫টি এবং একই এলাকার শামীমের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া কামরাঙ্গীরচরের সিদ্দিক মিয়ার বিরুদ্ধে ২৪টি, কোতোয়ালির শম্ভুনাথ সুরের বিরুদ্ধে ২০টি এবং অসিত নন্দীর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। শম্ভুনাথের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ২০১২ সালের ৩০ মে। সর্বশেষ মামলা হয় ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর।
পুুলিশের তালিকায় হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, লালবাগ, কোতোয়ালি, গেন্ডারিয়া, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, বনানী ও রূপনগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আরও অনেকের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই আছেন; কারও বিরুদ্ধে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসা সাধারণত একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, খুচরা বিক্রেতা, অর্থ জোগানদাতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগীরা যুক্ত থাকতে পারেন। ফলে কেবল পরিচিত বিক্রেতা বা বাহককে গ্রেপ্তার করে অভিযান শেষ করলে একই নেটওয়ার্কের অন্য সদস্যরা দ্রুত ব্যবসা চালু করতে পারেন। এ কারণে অভিযানে চিহ্নিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের যোগাযোগ, অর্থের লেনদেন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
