অনলাইন বিক্রি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই চালিত প্রোগ্রাম বা ‘বট’ (একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম) ব্যবহার করে ট্রেনের টিকিট বুকিং দিয়ে তা চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের সঙ্গে ট্রেনের টিকিট বিক্রির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেইউ’-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় প্রতিষ্ঠানটিকে এখন কড়া নজর দারিতে রেখেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে জানা যায়, বুকমাইরেলবিডিডটকম নামের একটি অননুমোদিত ও অবৈধ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা ‘বট’ ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক টিকিট কৃত্রিমভাবে ব্লক করে রাখা হতো। পরবর্তীতে সাধারণ যাত্রীরা যখন বৈধ উপায়ে টিকিট পেতেন না, তখন এই টিকিটগুলোই উচ্চমূল্যে কালোবাজারে বিক্রি করা হতো।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রেল কর্তৃপক্ষ টিকিট জালিয়াতি এবং বটের মাধ্যমে ব্লক করার বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ’-এর কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে রেল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর ব্লক করে দিয়েছে। অননুমোদিত টিকিট বুকিং সাইটটি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি টিকিটের দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম ও কালোবাজারি রুখতে রেলওয়ে এখন নতুন টিকিটিং এজেন্সি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমের একটি অডিটে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বেশকিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে টিকিট বিক্রির জন্য প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে। এসব অডিট পর্যবেক্ষণ বা প্রশ্নের জবাবে ‘সহজ’ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যার পর্যালোচনা করছে রেলওয়ে। এদিকে, কিছু স্টেশনে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছে রেলওয়ে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি টিকিটিং এজেন্সির জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, গত সপ্তাহে তারা অডিট রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন। কিছু পর্যবেক্ষণে ‘সহজের’ নাম এসেছে। আর বাকিগুলো রেলের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগ সংশ্লিষ্ট। তিনি বলেন, ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ১১ অক্টোবরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই সহজের যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত জবাব চাওয়ার সুপারিশ করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, ‘বুকমাইরেলবিডিডটকম’ নামে একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালিত ‘বট’ ব্যবহার করে চড়া দামে বিক্রি করতে বিপুল সংখ্যক টিকিট আটকে রাখা হতো।
সমন্বিত টিকিটিং চুক্তির অধীনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
গত ২০ অক্টোবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অডিটে দেখা গেছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই টিকিট আটকে রাখা বা হোল্ড করা সম্ভব ছিল।
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, কোচ যোগ বা বিয়োগ করা এবং সিটের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য কিছু স্টেশনে সহজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের জন্য কিছু সুবিধা রাখা হয়েছিল। কিছু অ্যাকাউন্ট স্টেশন মাস্টারদের নামেও নিবন্ধিত ছিল। এসব কাজ এখন থেকে রেলওয়ের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের অধীনে নিয়ে আসা হচ্ছে, এমনটিই তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট বিক্রির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন্স জেভি’-এর বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘বট’ ব্যবহার করে চড়া দামে টিকিট কালোবাজারি করা এবং আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অভিযোগসমূহ :
বট ব্যবহার ও টিকিট আটকে রাখা : বুকমাইরেলবিডিডটকম নামে একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ‘বট’ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ টিকিট চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হতো। অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট হোল্ড বা আটকে রাখা সম্ভব ছিল।
অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার : তদন্তে রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমে ১৬৯টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, সহজের কর্মী, রেলের বুকিং সহকারী এবং টিকিট মাস্টারদের পারস্পরিক যোগসাজশে এই অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে কালোবাজারি করা হতো।
আর্থিক অনিয়ম ও জরিমানা : ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পরিচালিত নিরীক্ষায় আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেছে। অনলাইন টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, ‘সহজ’-এর কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার বিষয়টিও অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে।
রেলওয়ের পদক্ষেপ : কালোবাজারি রোধে রেলওয়ে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক করেছে।
অননুমোদিত ওয়েবসাইটটি বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে (ইঞজঈ) অনুরোধ জানানো হয়েছে। টিকিট ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ (কোচ যোগ/বিয়োগ এবং সিটের তথ্য হালনাগাদ) এখন স্টেশন থেকে সরিয়ে রেলওয়ের নিজস্ব পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের অধীনে নেওয়া হচ্ছে।
সহজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : সহজ লিমিটেডের জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, তারা পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে। বিষয়টি এখন পর্যালোচনাধীন থাকায় এই মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে তারা তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
টিকিট কালাবাজারিতে সহজের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, জানতে চাইলে রেল মহাপরিচালক বলেন, এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং একাধিক বিষয়ে রেলওয়ে প্রমাণ পেয়েছে। আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরো আলোচনার পর পরবর্তী ব্যবস্থা ঠিক করা হবে। যোগাযোগ করা হলে সহজ লিমিটেডের সিইও লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) আমিনুল হক প্রতিষ্ঠানটির পিআর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে পিআর প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্কের মাধ্যমে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, রেলের পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছে সহজ। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরীক্ষায় উঠে আসা বিষয়গুলো চুক্তির শর্ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া তথ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। সুতরাং, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। সহজ জানায়, তারা অডিট প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা বজায় রাখবে এবং যাত্রীসেবা, ডেটা নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাবে।
কালাবাজারি রোধে রেলওয়ে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্লক করেছে বলে জানান ডিজি আফজাল। এছাড়া, ওই অননুমোদিত ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অনুরোধ জানিয়েছে রেলওয়ে। গত ৮ অক্টোবর ওয়েবসাইটটি বন্ধ এবং টিকিটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিআলো/অর্নব