ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও সেই পরিস্থিতি থেকে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে বিশ্বের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলো। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে কোম্পানিগুলোর পরিশোধন ও জ্বালানি বাণিজ্য বিভাগে আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বড় তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে বাড়তি আয় কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়ে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় বাজারে দামের ওঠানামা বেড়ে যায় এবং জ্বালানির দাম বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
বাজারের এই অস্থিরতা বড় তেল কোম্পানিগুলোর ট্রেডিং বিভাগকে বাড়তি মুনাফার সুযোগ করে দিয়েছে। তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করলে ক্রয়-বিক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ট্রেডিং বিভাগগুলো আয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় শোধনাগার ব্যবসার মুনাফাও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের আয় বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা দীর্ঘমেয়াদে একই পর্যায়ে থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি বিপির তৃতীয় প্রান্তিকের নিট আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫৫ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সময়ে শেভরন, এক্সনমোবিল, শেল, বিপি ও টোটালএনার্জিজের মতো শীর্ষ কোম্পানিগুলোর শোধনাগার মুনাফার মার্জিন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এ হিসাব বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বাজার অস্থিরতা এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেল জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের শোধনাগার ব্যবসার মার্জিন প্রতি ব্যারেলে ৪২ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের মার্জিন বৃদ্ধি কোম্পানিটির পরিশোধন কার্যক্রম থেকে আয় বাড়াতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিজ আশা করছে, তাদের শোধন ও রাসায়নিক ব্যবসা থেকে নগদ প্রবাহ দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সনমোবিলও শোধনাগার ব্যবসায় বাড়তি আয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। কোম্পানিটির ধারণা, উচ্চ শোধনাগার মার্জিনের কারণে তাদের ডাউনস্ট্রিম বা পরিশোধন ও বিপণন ব্যবসার মুনাফা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৪৫০ কোটি ডলার বাড়তে পারে। ফলে তেল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিশোধন, বিপণন ও জ্বালানি বাণিজ্য থেকেও বড় কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে বাড়তি মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হবে। অতীতে তেলের দাম বেড়ে গেলে অনেক জ্বালানি কোম্পানি উৎপাদন সম্প্রসারণ ও নতুন প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগকারীরা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণ কমানো এবং শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে চলতি প্রান্তিকে আয় বাড়লেও কোম্পানিগুলো আগের মতো ব্যাপক ব্যয়ে ফিরবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক বিরাজ বরখাটারিয়ার মতে, তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের সময় কোম্পানিগুলোর বাড়তি অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনাই বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখন পর্যন্ত এক্সনমোবিল ও শেভরন তাদের অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করেছে। এতে আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাজারের নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
শেভরনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকেও নজর রাখছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় কোম্পানিটির বিনিয়োগ এবং কাজাখস্তানের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র টেঙ্গিজে যৌথ উদ্যোগের চুক্তি সম্প্রসারণের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে, শেল ও শেভরনের মতো কোম্পানি শেয়ার পুনঃক্রয় বা বাইব্যাক কর্মসূচি বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে এইচএসবিসি। বাইব্যাকের মাধ্যমে কোনো কোম্পানি বাজার থেকে নিজেদের শেয়ার কিনে নেয়, যা শেয়ারহোল্ডারদের কাছে অর্থ ফেরত দেওয়ার একটি পদ্ধতি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শেল বছরের শুরুতে তাদের প্রান্তিকভিত্তিক বাইব্যাক কর্মসূচি কমিয়ে ৩০০ কোটি ডলারে এনেছিল। তবে আয় বাড়তে থাকলে চতুর্থ প্রান্তিকে তা আবার ৩৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে।
বিপির ক্ষেত্রেও বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক ট্রেডিং আপডেটের পর বিনিয়োগ ব্যাংক টিপিএইচ কোম্পানিটিকে ইউরোপের তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যাংকটির হিসাব অনুযায়ী, শোধনাগার, গ্যাস বিপণন ও ট্রেডিং থেকে বিপির মূল মুনাফা ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ মুনাফা ছিল ৫৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব ব্যবসা থেকে কোম্পানিটির আয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বিপি বর্তমানে বাড়তি অর্থ ব্যবহার করে নিজেদের ব্যালান্স শিট পুনর্গঠন ও ঋণ কমানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। সিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির নিট ঋণ ও পরিচালন নগদ প্রবাহের অনুপাত ছিল ১ দশমিক ৭ গুণ, যা পাঁচটি বড় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে তৃতীয় প্রান্তিক নাগাদ এ অনুপাত কমে ০ দশমিক ৮ গুণে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এমনটি হলে কোম্পানিটির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও আর্থিক অবস্থানে উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
আগামী ১৫ ডিসেম্বরের কৌশলগত পর্যালোচনায় বিপি তাদের ভবিষ্যৎ মূলধন বণ্টনের পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এইচএসবিসির বিশ্লেষক কিম ফাস্টিয়ার ও সদনান আলীর মতে, কোম্পানিটির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ঋণ কমানো, মূলধনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ২০২৮ সালের আগে শেয়ার পুনঃক্রয় কর্মসূচি পুনরায় শুরু না করা। তাদের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বাড়তি মুনাফা অর্জনের পরও সব কোম্পানি তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পথে হাঁটবে না।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও বাজারের অস্থিরতা বড় তেল কোম্পানিগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই মুনাফা কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে তেলের দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিকতার ওপর। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ঋণ পরিশোধ, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও শেয়ার পুনঃক্রয়ের সিদ্ধান্তও তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
