প্রতিদিন একটি কলা, এক বাটি ডালিম কিংবা এক বেলার খাবারে বিটরুট—এসব খাবার কি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে? হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান এসব খাবারে রয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিই উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জাদুকরি সমাধান নয়। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এসব খাবার খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরে ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। এ ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাসও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডালিম: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস
ডালিমে প্রচুর পলিফেনল রয়েছে। এটি একধরনের উদ্ভিজ্জ উপাদান, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
কিছু ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, ডালিমের রস রক্তচাপ সামান্য কমাতে পারে। তবে এ বিষয়ে গবেষণার ফলাফল এখনো একরকম নয়। ডালিমের সম্ভাব্য উপকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পুরো ডালিম খেলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পাশাপাশি খাদ্যআঁশও পাওয়া যায়। কেউ রস পান করতে চাইলে চিনি ছাড়া রস বেছে নেওয়া এবং একবারে প্রায় ১৫০ মিলিলিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ভালো। তবে রসের তুলনায় গোটা ফল খাওয়া সাধারণত বেশি উপকারী, কারণ এতে খাদ্যআঁশ অক্ষুণ্ন থাকে এবং পেটও বেশি সময় ভরা থাকে।
ডালিম হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে, তবে এটি উচ্চ রক্তচাপ কমানোর তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার নয়।
বিটরুট: রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক
বিটরুটে প্রাকৃতিক নাইট্রেট থাকে। শরীর এই উপাদানকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত করে, যা রক্তনালিকে শিথিল ও প্রসারিত করতে সাহায্য করে। ফলে রক্তপ্রবাহ সহজ হতে পারে।
বিটরুটের রস নিয়ে গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক। ২০২২ সালে প্রকাশিত সাতটি র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ২১৮ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, নাইট্রেটসমৃদ্ধ বিটরুটের রস গ্রহণকারীদের সিস্টোলিক বা ওপরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় গড়ে প্রায় ৫ মিমি পারদ কমেছে। তবে ডায়াস্টোলিক বা নিচের রক্তচাপের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
প্রতিদিনের খাবারে প্রায় ৭৫–১০০ গ্রাম বিটরুট সালাদ, ভাজি বা রান্না করা সবজি হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে প্রায় ১৫০–২০০ মিলিলিটার বিটরুটের রস পান করা যায়। তবে এই পরিমাণকে রক্তচাপ কমানোর জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত চিকিৎসামাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বিভিন্ন বিটরুটের রসে নাইট্রেটের পরিমাণও ভিন্ন হতে পারে।
যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের বিটরুট খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এতে অক্সালেট থাকে। বিটরুট কখনোই চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্প নয়।
কলা: পটাশিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস
কলায় রয়েছে পটাশিয়াম, যা শরীরের তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সোডিয়ামের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা মোকাবিলায়ও পটাশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি মাঝারি আকারের কলায় আনুমানিক ৪০০–৪৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পাওয়া যায়। প্রতিদিন একটি কলা খেলে শরীরের পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণে কিছুটা অবদান রাখা সম্ভব। এ ছাড়া শাকসবজি, ডাল ও অন্যান্য ফল থেকেও এই খনিজ পাওয়া যায়।
তবে শুধু একটি কলা খেলেই রক্তচাপ কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে উপকার পাওয়া যায়।
যাদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ রয়েছে কিংবা যেসব ওষুধ রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়াতে পারে, তাদের পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এই তিনটি খাবারের বাইরেও রয়েছে উপকারী বিকল্প
শুধু ডালিম, বিটরুট ও কলার ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি রাখা জরুরি।
পালংশাক ও লালশাক: পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎস।
টমেটো ও ব্রকলি: শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।
ডাল ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার: খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান দেয়।
তরমুজ: এতে সিট্রুলিন নামের একটি উপাদান রয়েছে, যা শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তবে তরমুজ সরাসরি রক্তচাপ কমায়—এমন প্রমাণ এখনো সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি নির্দিষ্ট খাবারকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে বিবেচনা করার চেয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ড্যাশ ডায়েট কতটা কার্যকর?
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে ভালো প্রমাণ পাওয়া যায় সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে ড্যাশ (DASH—Dietary Approaches to Stop Hypertension) ডায়েট বিশেষভাবে পরিচিত।
এই খাদ্যপদ্ধতিতে ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত রাখতে বলা হয়।
ড্যাশ ডায়েট নিয়ে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফলমূল ও শাকসবজিসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। পূর্ণাঙ্গ ড্যাশ ডায়েট অনুসরণ করলে উপকার আরও বেশি হতে পারে। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাদ্যপদ্ধতির সঙ্গে সোডিয়াম গ্রহণ কমিয়ে দিলে রক্তচাপ আরও কমতে পারে।
লবণ কমানো ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু উপকারী খাবার খাওয়াই যথেষ্ট নয়। খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। প্যাকেটজাত নাশতা, আচার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে অনেক সময় প্রচুর লবণ থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সব উৎস মিলিয়ে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত।
পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখাও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
ডালিম, বিটরুট ও কলা—তিনটিই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে কোনো একটি খাবারই উচ্চ রক্তচাপের নিরাময় নয়। বরং বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুষম খাদ্যাভ্যাস, লবণ কম খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বেশি উপকার পাওয়া সম্ভব।
নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করুন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করুন। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার চিকিৎসায় সহায়ক—চিকিৎসার বিকল্প নয়।
সূত্র- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস