একদিন ১৫ লাখ মানুষের সামনে গিটার হাতে দাঁড়াবেন আইয়ুব বাচ্চু। দেশি-বিদেশি নামী সংগীতশিল্পীরা থাকবেন একই মঞ্চে। একের পর এক গান, গিটারের সুরে মেতে উঠবে দর্শক–শ্রোতা। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এমন একটি কনসার্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের এই কিংবদন্তি। শুধু কনসার্ট নয়, নতুন প্রজন্মের গিটারবাদকদের নিয়ে প্রতিযোগিতারও আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠারও, যেখানে নতুনেরা শিখবেন, নিজেদের গড়বেন। কিন্তু তাঁর সেসব স্বপ্নের কোনোটি পূর্ণতা পায়নি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হঠাৎ থেমে যায় তাঁর জীবনের পথচলা। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে আট বছর। আজও তাঁর সেই স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে, রয়ে গেছে গিটারগুলোও।

আইয়ুব বাচ্চু আজ বেঁচে থাকলে বয়স হতো ৬৪ বছর। হয়তো আরও অনেক গান উপহার দিতেন, নতুনদের হাতে তুলে দিতেন গিটার, কিংবা কোনো এক সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে যেতেন তাঁর বহুদিনের লালিত স্বপ্নের কনসার্ট মঞ্চে। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের এই সময়টায় তাঁর উপস্থিতি কেমন হতো, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সংগীতের আদান-প্রদান কত দূর এগোত—এসব প্রশ্নের উত্তর আর জানা সম্ভব না। তবে অপূর্ণ স্বপ্নগুলো মনে করিয়ে দেয়, আইয়ুব বাচ্চু শুধু নিজের জন্য গান করেননি; সংগীত ঘিরে আরও বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষাও সব সময় ছিল তাঁর।
গিটার নিয়ে অন্য রকম স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চুর কাছে গিটার কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না, ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় জায়গাজুড়ে। গিটার হাতে মঞ্চে ওঠা, সুরে সুরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা, দর্শক–শ্রোতা মাতিয়ে রাখা—এসবই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। দেশ–বিদেশের সংগীতপ্রেমীরা তাঁকে চিনেছেন গিটার জাদুকর হিসেবে। নিজের বাদন দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করার পাশাপাশি একটা সময় নতুন গিটারবাদক তৈরির কথাও ভাবতেন আইয়ুব বাচ্চু।
নবীন গিটারবাদকদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে চেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, বিজয়ীদের নিজের সংগ্রহের গিটারগুলো পুরস্কার হিসেবে দেবেন। যেসব গিটার নিয়ে তিনি বছরের পর বছর মঞ্চ মাতিয়েছেন, সেগুলোই একদিন নতুন কোনো শিল্পীর হাতে উঠবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় উদ্যোগটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
একইভাবে আইয়ুব বাচ্চুর স্বপ্ন ছিল একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার। সেখানে শুধু গিটার নয়, অন্য বাদ্যযন্ত্র শেখানোরও ব্যবস্থা রাখতে চেয়েছিলেন। নতুনেরা যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পান, নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন, সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারেন—এমন একটি পরিবেশ তৈরির ইচ্ছা ছিল তাঁর।

আইয়ুব বাচ্চু আজ বেঁচে থাকলে হয়তো সেই স্কুলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের শেখাতেন গিটার বাজানোর নানা কৌশল, সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা এবং নিয়মিত অনুশীলনের গুরুত্ব। তাঁর তত্ত্বাবধানে তৈরি হতে পারত নতুন একদল গিটারবাদক, যাঁরা নিজেদের মতো করে বাংলা ব্যান্ডসংগীতকে এগিয়ে নিতেন। অবশ্য এটি কেবলই সম্ভাবনা; বাস্তবে সেই স্বপ্ন কত দূর এগোত, তা বলার অবশ্য সুযোগ নেই। তবে নতুনদের জন্য কিছু করার যে ইচ্ছা তাঁর ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
১৫ লাখ দর্শকের সামনে গিটার হাতে
কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি বরাবরই আলাদা মাত্রা যোগ করত। গাইবার পাশাপাশি তাঁর গিটারবাদনে মুগ্ধ হননি এমন শ্রোতা পাওয়া যাবে না। মঞ্চে গিটার হাতে দাঁড়ালে তিনি যেন অন্য এক মানুষ হয়ে যেতেন। কখনো গিটারের তারে ঝড় তুলতেন, কখনো দীর্ঘ একক পরিবেশনায় শ্রোতাদের নিয়ে যেতেন অন্য এক জগতে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক আড্ডায় নিজের স্বপ্নের কনসার্টের পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ইচ্ছা ছিল, ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল এক কনসার্ট আয়োজন করবেন। সেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পীরা একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করবেন। বিদেশি শিল্পীদের তালিকায় তাঁর পছন্দের মধ্যে ছিলেন মার্কিন গায়ক ও গিটারবাদক স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি ও কার্লোস সান্টানা। ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজের কথাও বলেছিলেন। দেশীয় শিল্পীদের মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদকে। স্বপ্নের সেই আয়োজন নিয়ে বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমরা একটা স্লট বাজাব, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।’
কথাটা বলার সময় তাঁর চিন্তায় ছিল বিশাল এক মঞ্চ, অসংখ্য দর্শক আর গিটারের সুরে মুখরিত একটি সন্ধ্যা। কিন্তু সেই কনসার্ট আর আয়োজন করা হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর আট বছর পেরিয়ে গেছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দাঁড়িয়ে ১৫ লাখ দর্শকের সামনে গিটার বাজানোর স্বপ্নটি এখনো অপূর্ণ।
সুরের ভেতর দিয়ে যাঁর দীর্ঘ পথচলা
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর টান। বাবার কাছ থেকে প্রথম গিটার পাওয়ার পর শুরু হয় তাঁর অনুশীলন। বিটিভিতে নয়ন মুন্সীর গিটার বাজানো দেখে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। পরে নিজেই গিটার শেখার চর্চা শুরু করেন। সেই চর্চা, একাগ্রতা আর চেষ্টা তাঁকে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র একজন গিটারবাদক হিসেবে পৃথিবীর সব বাঙালির কাছে পরিচিত করে। শিল্পীদের কাছেও অনুপ্রেরণার একজন হয়ে ওঠেন।
সংগীতজীবনের শুরুর দিকে বিভিন্ন ব্যান্ডে বাজিয়েছেন। পরে যুক্ত হন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। সেখানে কাজ করতে করতেই গিটারবাদক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড—‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, সংক্ষেপে এলআরবি। পরে নামটির পূর্ণরূপ হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’। এলআরবির সঙ্গে তাঁর পথচলা বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’ কিংবা ‘এখন অনেক রাত’—গানগুলো আজও শ্রোতাদের কাছে সমান প্রিয়। তাঁর গিটারের সুরে ছিল রকসংগীতের তীব্রতা, ব্লুজের বিষণ্নতা আর মেলোডির মায়া। গিটারকে শুধু গানের সংগত হিসেবে নয়, নিজস্ব ভাষায় কথা বলার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আইয়ুব বাচ্চুর গান তাই কেবল একটি প্রজন্মের ভালোবাসা ও আবেগ নয়। নতুন প্রজন্মও তাঁর গান শুনছে, গাইছে, নিজেদের মতো করে নিরীক্ষাও করছে। তিনি আজ বেঁচে থাকলে হয়তো এই তরুণদের সঙ্গে কাজ করতেন, সংগীতের নতুন ধারার সঙ্গে পরিচিত হতেন, তাঁদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিতেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আর নতুনদের নিরীক্ষা মিলে তৈরি হতে পারত ভিন্ন স্বাদের সংগীত।
গিটারগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে?
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর সংগৃহীত গিটারগুলো নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। প্রতিটি গিটারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর সংগীতজীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়। কোনোটি হয়তো মঞ্চে বাজিয়েছেন, কোনোটি দিয়ে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় গানের সুর, আবার কোনোটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের অংশ। কিন্তু গিটারগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোকে ঘিরে তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়নটাও দরকার। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতেন, নিজের সংগ্রহের যন্ত্রগুলো নতুনদের শেখানোর কাজে ব্যবহার করতেন। তাঁর ব্যবহৃত গিটার নিয়ে আয়োজন করা যেত প্রদর্শনী, যেখানে নতুন প্রজন্ম জানতে পারত বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর গিটার, গানের পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতজীবনের নানা স্মারক নিয়ে গড়ে উঠতে পারত একটি সংগ্রহশালা। পাশাপাশি তাঁর গান ও গিটারবাদনের ভিডিও, সাক্ষাৎকার এবং সংগীতচর্চার দলিলগুলো নিয়ে একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল আর্কাইভ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দারুণ কিছু হতে পারত।

আইয়ুব বাচ্চুর ২৭২টি গান সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ও ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছিল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে। এমন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন, যাতে তাঁর সৃষ্টিগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় এবং পরবর্তী প্রজন্ম সেগুলো থেকে শিখতে পারে। শুধু স্মরণসভা বা মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন নয়, তাঁর সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সম্মান।
অপূর্ণতা থেকে যায়, সুর থেকে যায়
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আট বছর পরও সংগীতাঙ্গনে তাঁকে নিয়ে চলে আলোচনা। দিন যতই যাচ্ছে, তাঁর গানের প্রভাব যেন আরও বাড়ছে। তিনি হয়তো গানগুলো গাইছেন না, কিন্তু পরের প্রজন্মের অনেকে বিভিন্ন মঞ্চে কিংবা আয়োজনে বিভিন্ন সময় গাইছে। আইয়ুব বাচ্চুর অনুজেরা তাঁকে স্মরণ করেন, তাঁর গান থেকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা নেন। সংগীতশিল্পী শুভ একবার প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছিল তাঁর। মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে বিমানবন্দরে দেখা হলেও সেই ভুল–বোঝাবুঝি দূর করতে পারেননি। এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়ে গেছে। শুভর মতে, ‘আমার পুরো সংগীতজীবনে তাঁর একটা বিরাট প্রভাব আছে। তাঁর একটা কথা শুনলেই আশীর্বাদের মতো মনে হতো।’
২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘বাচ্চু থাকলে বেশি খুশি হতো। পুরস্কারটা নিজে হাতে নিতে পারলে খুশি হতো।’

আজ আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকলে হয়তো একুশে পদক হাতে নিয়ে হাসতেন, নতুন কোনো গানের পরিকল্পনা করতেন, কিংবা আবারও বলতেন ১৫ লাখ দর্শকের সামনে কনসার্ট করার কথা। হয়তো তাঁর গিটার স্কুলে নতুন কোনো কিশোর প্রথমবারের মতো গিটারের তারে হাত রাখত। হয়তো তাঁর সংগ্রহের একটি গিটার কোনো তরুণ শিল্পীর হাতে উঠে আসত। কিংবা নতুন প্রজন্মের কারও সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিটারের সুরে তৈরি করতেন নতুন কোনো ইতিহাস।
