দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সফল হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্র।
- নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সফল
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সফল হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্র। গতকাল রোববার বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া (ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি) শুরুর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এই প্রক্রিয়াকে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বলা হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর ঘটনা কেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সময়সূচি নির্ভর করবে কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতির রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী হবে এবং গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা টারবাইন ঘোরায়। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।
রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপেক্ষা, স্বস্তির আশা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ:
এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বিপুল বিনিয়োগ আর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম এগোলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এই সম্ভাবনা দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর প্রত্যাশা জাগিয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিপুল বিনিয়োগের যথাযথ সুফল পাওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব সামাল দেওয়া এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ফলে রূপপুরের উৎপাদন শুরুর সম্ভাবনা একদিকে যেমন বিদ্যুৎ খাতে স্বস্তির আশা তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত অবদান নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
ডিসেম্বরে গ্রিডে বিদ্যুৎ, এখনো বাকি কয়েক ধাপ:
গত ৮ অক্টোবর রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স হস্তান্তর করে বায়েরা। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মইনুল হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানের হাতে লাইসেন্স তুলে দেন।
এ অনুমোদনের ফলে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরুর পথ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এর আগে রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরপর রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরামিতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ধাপসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এরপর শুরু হবে ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়। এ সময় টারবাইন ও জেনারেটরের সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের সমন্বয় পরীক্ষা করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। এজন্য পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়েরা থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্সও নিতে হবে।
এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে গ্রিডে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হলেও শুরুতেই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন হবে না। প্রথমে কম ক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করে ধাপে ধাপে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রিডে সংযোগের পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত চলতে পারে।
’রূপপুরের দুটি ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। তবে বাস্তবে কতটা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতার ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুতের চাহিদা এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ধারাবাহিকতার ওপর।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার পাশাপাশি রূপপুরকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা মোকাবিলা, তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তামান এবং অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে নির্মাণপর্বে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপনই যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার পুরো সময়জুড়ে নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, দক্ষ জনবল এবং জরুরি ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রস্তুতি বজায় রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আশপাশের জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় জানানো এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি। মানুষের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছভাবে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরতে পারলে প্রকল্পটির প্রতি আস্থা বাড়বে।
ব্যয় বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা:
রূপপুর দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির শর্তের কারণে শুধু মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পেতে উৎপাদনক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রটির প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, ঋণ পরিশোধের চাপ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং বিদ্যুৎ বিক্রির আর্থিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রূপপুরের প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। কারিগরি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে ভবিষ্যতে এ মেয়াদ আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে। এত দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
