গানে গানে মানবতার জয়গান, সাধুসঙ্গে আত্মার সন্ধান। বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস ঘিরে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে চলছে শেষ মুহূর্তের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সাজসজ্জা, মঞ্চ নির্মাণ আর দোকানিদের আনাগোনায় বাড়ছে উৎসবের আমেজ। তবে এ আয়োজন শুধু স্মরণোৎসব নয়; এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য, আত্মসাধনা আর মানবতার দর্শন।
‘নিগূঢ় প্রেম কথাটি তাই আমি শুধাই কার কাছে, যদি তরিতে বাসনা থাকে, ধর রে মন সাধুর সঙ্গ।’
লালন সাঁইজির গানের এই আহ্বান যেন আজও মানুষকে টানে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়। সাধুসঙ্গের টানে এখানে ছুটে আসেন সাধু-বাউল ও ভক্তরা। আগামী ১৭, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন মাঠে বসতে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন সাধু-বাউল ও লালনভক্তরা। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রস্তুতির ব্যস্ততা।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য আলমাস হোসেন বলেন, ‘মেলার প্যান্ডেল নির্মাণ ও মাঠের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ প্রায় শেষের পথে।’ এবারই প্রথম মেলার জন্য আলাদা একটি রাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলাকে সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের একটি সুন্দর মেলা উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ফকির লালন শাহের ঘরের রেজা ফকির বলেন, ‘লালন শাহের ঘর, পাঞ্জু শাহের ঘর, দেলবার শাহের ঘর, চৌধুরীর ঘর ও সতীমার ঘর এই পাঁচ ঘরের গুরুপাঠ আলাদা হলেও তাদের মতাদর্শ ছিল প্রায় একই। সেই অভিন্ন দর্শন, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক বন্ধনের টানে পাঁচ ঘরের অনুসারীরা একত্রিত হয়ে সাধুসঙ্গে মিলিত হতেন।
ফকির লালন শাহ জীবিত থাকাকালে দোল পূর্ণিমার উৎসবকে কেন্দ্র করে সাধুসঙ্গের যে ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল, তা শুধু একটি উৎসব নয়; বরং গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, আধ্যাত্মিক সাধনা, সম্প্রীতি ও ভাববিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা। আমরা সেই ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে আজও সাধুসঙ্গের আয়োজন করে আসছি।’
লালন অনুসারীদের ভাষ্য, লালন সাঁইজি জীবিত থাকাকালে দোল পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সাধুসঙ্গের আয়োজন করতেন। সেই ঐতিহ্যে সাধুসঙ্গ ছিল শুধু গান বা আচার-অনুষ্ঠান নয়; বরং আত্মসাধনা, দর্শনচর্চা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্র।
লালনের গানে মানুষই ছিল মুখ্য। তার দর্শনে ‘মনের মানুষ’ আর ‘অচিন পাখি’ হয়ে উঠেছে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার রহস্য অনুসন্ধানের প্রতীক। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গানে দেহ ও অন্তরের সেই রহস্য তুলে ধরেছেন সাধক লালন। জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার আহ্বান ছিল তার গানে।
মানবপ্রেম, সাম্য ও আত্মসাধনার এই দর্শন আজও আকৃষ্ট করে সাধু-বাউল, গবেষক ও ভক্তদের। তাই ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি কেবল স্মরণোৎসবের স্থান নয়; এটি মানুষকে নতুন করে চেনার, নিজের ভেতরে খোঁজার এবং মানবতার বাণী উপলব্ধির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
লালন অনুসারী মামুন সাধু বলেন, ‘জয় হোক দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের, জয় হোক ফকির লালন সাঁইয়ের! সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে আগামী ১৭, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর লালন মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে মেলার প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।’
তিন দিনের স্মরণোৎসবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগমের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার বলেন, ‘মেলার নিরাপত্তার জন্য কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।’
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মেলা শুরুর আগ পর্যন্ত পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি মেলার মাঠ ও মাজার এলাকায় টহল দল দায়িত্ব পালন করছে।’
লালন শাহের মাজারের প্রধান খাদেম মোহাম্মদ আলী শাহ লালন সাঁইজির জীবন ও স্মৃতিবিজড়িত নানা ঘটনা তুলে ধরেন। তার বর্ণনায়, প্রায় আড়াইশ বছর আগে তৎকালীন কালীগঙ্গা নদীতে একটি ভেলায় অসুস্থ এক শিশুকে পাওয়ার ঘটনা লালন সাঁইজির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ওই শিশুর বয়স নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ঘটনার ঐতিহাসিক বিবরণে মতভেদ থাকায় বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
‘ধর রে মন সাধুর সঙ্গ’-লালনের গানের এই বাণীকে ধারণ করেই যেন গড়ে ওঠে সাধু-বাউলদের মিলনমেলা। কালীগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে ছেঁউড়িয়ার এই আয়োজন হয়ে ওঠে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনক্ষেত্র। ধর্ম-বর্ণ ও জাতপাতের বিভেদ ভুলে মানুষ মিলিত হন একই আঙিনায়।
