প্রথম আলো
‘তিন ফাঁদে আটকে গেছে দেশের অর্থনীতি’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি তিনটি কাঠামোগত ফাঁদে পড়েছে। প্রথম ফাঁদ হচ্ছে পরিবারের আর্থিক দুর্দশা বাড়ছে। এ কারণে ঋণ করে ও সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে একটি শ্রেণি। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে গেছে; আর তৃতীয়টি হচ্ছে, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার ফাঁদ। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই তিন ফাঁদ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।
সংস্থাটি বলেছে, অর্থনীতি আটকে রয়েছে ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র ফাঁদে। এসব ফাঁদে পড়ে দারিদ্রে৵র হার বাড়ছে, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি চলছে। আর তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাই টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য এই কাঠামোগত ফাঁদ ভাঙা অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে পিপিআরসি।
পিপিআরসি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথাগুলো বলা হয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস (১৭ অক্টোবর) উপলক্ষে গতকাল শনিবার এ প্রতিবেদন বই আকারে প্রকাশ করা হয়। ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল সকালে আয়োজন করা হয় বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের। গত বছরের মে মাসে দেশের ৮ বিভাগের গ্রাম ও শহরের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনটি বই আকারে প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান ও সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম।
অনুষ্ঠানে নির্ধারিত আলোচক ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক, একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম। স্বাগত বক্তব্য দেন পিপিপিআরসির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ এম হাশেমী।
অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ফাঁদের কথা স্বীকার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একদিকে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর জন্য অর্থের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী।
অর্থের অপচয়কে অর্থনীতির জন্য আরেক বড় সমস্যা উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, গরিব দেশ, অথচ ভবন তৈরি হচ্ছে; কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে; কিন্তু পড়াশোনা নেই। এ কারণে বাইরে থেকে লোক এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। তাই দেশের জন্য দরকার এখন গুণগত মানের শিক্ষায় জোর দেওয়া।
ঝুঁকিতে তিন কোটি মধ্যবিত্ত
অর্থনীতির প্রথম ফাঁদের ব্যাখ্যা দিয়ে পিপিআরসি বলেছে, কাজ করেও অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছে না। সংসারের আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য এত কম যে সামান্য ধাক্কা সামলানোর মতো সঞ্চয়ও থাকছে না অনেক পরিবারের। পিপিআরসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার এখন ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও এই শ্রেণির মানুষদের ব্যয় করার সক্ষমতা কম। এমন মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ১০ লাখ। তাঁদের অর্ধেকের বেশি পরিবারের ঋণ সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। অথচ ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
পিপিআরসির জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা; আর ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। তাতে মাস শেষে হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। ঘাটতি মেটাতে এসব পরিবারকে হয় ঋণ করতে হচ্ছে, না হয় সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম। তার বিপরীতে এসব পরিবারের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ খাবারের পেছনে চলে যায়। ফলে শিক্ষা, যাতায়াত ও চিকিৎসায় ব্যয় করার টাকা থাকে না তাদের। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, চিকিৎসার ব্যয় তাদের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ।
বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কম প্রবৃদ্ধির ফাঁদ
পিপিআরসির প্রতিবেদনে বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের তথ্য তুলে ধরে পিপিআরসি বলছে, প্রবৃদ্ধির ধীরগতির পাশাপাশি বিনিয়োগে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। গত অর্থবছরে বেসরকারি ও সরকারি উভয় বিনিয়োগই কমেছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে নতুন মূলধন বিনিয়োগ, ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। বিনিয়োগের এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন শিল্প গড়ে ওঠা, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সীমিত হতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদনশীল খাতে পুঁজিপ্রবাহ বাড়ানোও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মত দেয় সংস্থাটি।
সংস্থাটি বলছে, দেশে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোগ বেশি থাকলেও সেগুলোকে বড়, উৎপাদনশীল ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ সীমিত। নতুন ব্যবসা হলেও সেগুলো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও আয় তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার অমিলও সমস্যা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থা অর্থনীতির জন্য এমন এক ফাঁদ, যেখানে মানুষ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও উন্নত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আয় ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।
শাসনব্যবস্থার ফাঁদ
পিপিআরসি বলেছে, দারিদ্র্য থেকে টেকসই উত্তরণের পথে বড় বাধা রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন অর্থায়ন ও সরকারি ব্যয়ে অদক্ষতার একটি ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল।। গণ-অভ্যুত্থানের পরও এই ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো টিকে আছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসায় সরকারের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়িয়ে বাজেটের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করেছে।
পিপিআরসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খামখেয়ালি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা রাজস্ব ফাঁকি, ব্যবসায়িক হয়রানি এবং অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সুযোগ বাড়াচ্ছে। এসব দুর্বলতা কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সে উদ্যোগের আগ্রহ কম। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া ও নিয়মকানুন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
উত্তরণের পথ কী
অর্থনীতির এসব ফাঁদ থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে পিপিআরসি। তার প্রথমটি হচ্ছে, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এ–সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা, ঋণ, লাইসেন্স, জমি ও সরকারি চুক্তির জন্য বিশেষ সুবিধা বা বিবেচনানির্ভর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন চালক তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। পিপিআরসি বলছে, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন-সরবরাহসেবা ও পরিচর্যাসেবাকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির মতে, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নয়, মৌলিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল জ্ঞান এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথ করে দেওয়া আর পঞ্চমত, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। অর্থাৎ সরকারি সেবা হতে হবে স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত।
যা বললেন আলোচকেরা
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে আয় বৈষম্য দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না। এ ছাড়া নানা ক্ষেত্রে হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, যে বৈষম্য দূর করার জন্য জুলাইয়ে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকদের কাছে তা অর্থবহ হচ্ছে না।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘২০ বছর ধরে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে ডিগ্রি এখন চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থায়ন ও জ্বালানি–দক্ষতা বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দুর্নীতি ও হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ বহাল রেখে দেশে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সন্দেহ হয়।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপতে মিলেমিশে লুটপাট’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র সিন্ডিকেটের কবজায়। দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করে চক্রটি পছন্দের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রভাব খাটিয়ে এভাবেই দরপত্রের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একশ্রেণির কর্মকর্তা ও প্রেস মালিকদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত যোগসাজশে কৌশলে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এ কাজে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু নথিপত্র উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এনসিটিবির দরপত্রের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন শ্রেণির বই মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য আহ্বান করা ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতেই মাত্র একজন করে দরদাতা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এছাড়া ১৩টি দরপত্রে দুটি এবং বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে। কয়েকটি প্রেস মালিকের অনুরোধে নিয়মবহির্ভূতভাবে দরপত্র চলাকালে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটা নজিরবিহীন। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রের কোনোটিতেই একক দরদাতা ছিল না। পুরোনো চক্র ফের সক্রিয় হয়ে সরকারি অর্থ লুটপাট করেছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান যুগান্তরকে বলেন, এবার বইয়ের দরপত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি। এনসিটিবি ও কিছু মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক যোগসাজশে সরকারের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই। সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করলে এক্ষেত্রে এনসিটিবি উলটো পথে হাঁটছে। দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের ফর্মাপ্রতি গড় মুদ্রণমূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেখানে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা। গত বছরের তুলনায় দর বেড়েছে প্রায় ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য পুনর্নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে, যা এনসিটিবির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। এতে পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বণ্টন ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রে মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেল, প্রেস মালিক দুলাল সরকার, এসএম মহসিন, মিন্টু মোল্লা, হুমায়ুন কবির, শেখ সিরাজ, পারভেজ ও সুহেলের নাম এসেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। চক্রটি ইতোমধ্যে এনসিটিবির প্রায় হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রমা ও ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক এসএম মহসিন যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবিতে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। আমি এবার খুব বেশি কাজ পাইনি। তবে অনিয়মের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবার তিনি প্রায় ১২০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছেন।
এসব অনিয়মে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, প্রতিষ্ঠানটির সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া প্রেস মালিকদের এ চক্রটির এনসিটিবির গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কয়েক কোটি অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এসব কর্মকর্তাকে পদে বসানোর অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। প্রেস চক্রটির বিরুদ্ধে পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো এবং এনসিটিবির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লিগ সরকারের সময়ও এই চক্রের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা রয়েছে। দরপত্রে লুটপাটের অর্থ বিভিন্ন মহলে ভাগবাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলমান দরপত্রে বিধিবহির্ভূতভাবে দর বাড়ানো এবং গোপন দর ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকুর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে তাকে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অভিযোগ সম্পর্কে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা যুগান্তরকে বলেন, আমরা যথাসময়ে বই দেওয়ার চেষ্টা করছি। যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়।
বই ছাপানোর চুক্তি অনুযায়ী, ৪০ দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও কয়েকটি প্রেস বই সরবরাহ করছে না। চুক্তি ভঙ্গ করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বই সরবরাহের চুক্তির সময়সীমা তুলে দিতে এনসিটিবির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে প্রেস চক্রের বিরুদ্ধে। দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরের ৩৩৭ ও ৪০৪ নম্বর লট এবং মাধ্যমিক স্তরের ৬৭১ নম্বর লটে কাওসারুজ্জামান রুবেলের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি দর দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি এবার প্রায় তিন কোটি বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে।
সম্প্রতি দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে প্রেস মালিকদের এই চক্রটি সতর্ক হয়ে যায়। পরে চলতি মাসে নতুন চারটি বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলে সেখানে ভিন্নচিত্র দেখা যায়। ৯২১, ৯৩২, ৯৪৫, ৯৪৭ ও ১০১২ নম্বর লটে ৩১ থেকে ৩৪টি প্রেস প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ও পরের দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রতিযোগিতার চিত্রে বড় ধরনের অনিয়ম স্পষ্ট হয়। এসব দরপত্রে দর ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার ব্যবধানও দৃশ্যমান। তবে বই ছাপানোর কাজে কার্যকর প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি কমত। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। এ কাজে সরকারের ব্যয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে ব্যয় হয় প্রায় এক হাজার ৬ শ কোটি টাকা।
কালের কণ্ঠ
‘রিসোর্টে পুড়ল ১০ প্রাণ’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নারী-শিশুসহ ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশে ইট ও কাঠের তৈরি তিনতলা ‘টুপটুপ’ নামের রিসোর্টে গতকাল শনিবার সকাল ৭টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
এ সময় অনেকে ঘুমিয়ে ছিল। এ কারণে আগুনের লেলিহান শিখায় কক্ষেই অঙ্গার হয়েছে নিহত পর্যটকরা। নিহতদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের।
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সর্বশেষ ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে আটজনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। গেছে। এ ছাড়া আরো ছয়জন আহত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে মৃত ব্যক্তিরা হলেন রাজধানী ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫), ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতির স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী।
নাফিস বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ‘চায়নিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন সাদী (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আগুন থেকে বাঁচতে যাঁরা লাফ দিয়েছেন, তাঁরাই শুধু প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।
নারী ও শিশুরা লাফ দিতে না পারায় তারা মারা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর গত ১৩ মে রিসোর্টটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রিসোর্টের রান্নাঘরের দিক থেকে বিকট শব্দের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন গ্রাস করে পুরো স্থাপনা। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান চালান। আগুনে রিসোর্টটির প্রায় পুরো স্থাপনাই পুড়ে যায়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রিসোর্টের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
পুলিশ জানিয়েছে, টুপটুপ রিসোর্টে মোট কক্ষ ছিল ৯টি। গত শুক্রবার রাতে তিন কক্ষের পর্যটকরা চেকআউট করে চলে যান। অন্য ছয় কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ-ছয় জন সকালে বেরিয়ে বিভিন্ন কাজে বাইরে ছিলেন। এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আগুন লাগার পর খবর পেয়ে সকাল ৮টা থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ শুরু করে এবং সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সবাই পালিয়ে গেলেও ম্যানেজার সুমন বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। চলতি বছরের জুন মাসে রিসোর্টটিকে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। কারণ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স ছিল না। এই রিসোর্টের নিচে রান্নাঘর ছিল। ওপরে ছিল আবাসিক ব্যবস্থা। রান্নাঘর থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের শিকার ৭৪% শিক্ষার্থী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বনভোজনের কথা বলে নবীন ছাত্রীদের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে সিনিয়র ছাত্রীরা অহেতুক ধমক দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ১০ ধরনের ডাক দিতে বলেন। ক্যাম্পাসে যাওয়া, ছেলেদের সঙ্গে মেশা ও ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো নিয়েও জেরা করা হয়। এক পর্যায়ে এক ছাত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়; পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। গত ৮ অক্টোবর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
মা বিজ্ঞান কম
তবে র্যাগিং বা বুলিংয়ের এমন ঘটনা দেশের শিক্ষাঙ্গনে নতুন নয়। এর আগে ৪ জুলাই র্যাগিংয়ের অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১২ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা ৩ জুলাই রাতে কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে গালাগাল, কান ধরানো এবং 'ম্যানার' শেখানোর নামে র্যাগিং ও মানসিক নির্যাতন করে।
এক দেশ-বিদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৪ শতাংশ কখনও না কখনও র্যাগিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা ওই গবেষণায় পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়া ৯ হাজার ৪৭৪ জনের মধ্যে ৭ হাজার ১১ জনেরই ছিল এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা। তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর মাত্রার র্যাগিংয়ের কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় এ ধরনের হয়রানির সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষন্নতার উপসর্গ এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মূল্যায়নে খারাপ শিক্ষাগত ফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
'বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের র্যাগিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব' শিরোনামের গবেষণাটি গত জুনে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশনের ২৪তম খণ্ডের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এর অনলাইন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর। বাংলাদেশের ৫৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকরা।
গবেষণার শুরুতে ১ হাজার ৫৭১টি উত্তর পাওয়া যায়। অসম্পূর্ণ ৯৭টি উত্তর বাদ দিয়ে বাকিদের তথ্য রাখা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৩ জন র্যাগিংয়ের শিকার হননি। তাদের বাদ দিয়ে ৭ হাজার ১১ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ইংরেজি 'বুলিং' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে এতে মৌখিক বিদ্রূপ, সামাজিকভাবে হেয় করা, শারীরিক ও অনলাইন হয়রানি এবং যৌন হয়রানির মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত। নারীদের মধ্যে গুরুতর বুলিং বেশি
উত্তরদাতার মধ্যে পুরুষ হিলেন ৪ হাজার ৯৮৫ জন বা ৭১ দশমিক ১ শতাংশ। নারী ২ হাজার ২৬ জন বা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বুলিংয়ের মাত্রা অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ সামান্য, ৩৩ শতাংশ মৃদু, ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে মাঝারি মাত্রার বুলিংয়ের শিকার ৫২ দশমিক ১ শতাংশ। গুরুতর মাত্রার অভিজ্ঞতা ৭ দশমিক ২ শতাংশের। নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের শিকার। তবে গুরুতর বুলিংয়ের হার নারীদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা পুরুষদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ইত্তেফাক
‘আগুনে ছাই হলো আনন্দের অবকাশ’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, পরিবার, স্বজন নিয়ে কক্সবাজারে আনন্দে অবকাশ যাপন করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারালেন ১০ জন। এদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজনসহ ৬ জন নিকটাত্মীয় রয়েছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা্লে নিহতদের মধ্যে শিশু ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও আছেন। এ ঘটনায় আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন আরও সাতজন। এখনো নিখোঁজ রয়েছে কয়েকজন। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান।
অগ্নিকা্লে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জন নিকটাত্মীয় হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা, তার তিন বোন- ফারিয়া কবির (৩৩), ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), ৫ বছর বয়সী এক ভাগ্নে ফাইজান নূর। নূর নাবিলার বড় বোন ফারিয়ার ছেলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী। নিহত নাফিজ, নাবিলা, ফারিয়া, মালিহা ও আলভী পরস্পরের কাজিন। নাফিজের পরিবারের নয়জন সদস্য কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন বেঁচে গেছেন।
নিহতদের মধ্যে আরও আছেন নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অন্য দুই নিহত পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের বিস্তারিত পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আরেকজনকে শনাক্ত করা যাইনি। তার ডিএনএ পরীক্ষা হবে।
রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে এবং এর তীব্রতা বাড়তে থাকলে ভেতরে থাকা পর্যটকেরা প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। কয়েকজন দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়েও প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন।
এ সময় আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি হন সাতজন। এরা হলেন ঢাকা মহানগরীর পশ্চিম রামপুরার শিহাব সাদি (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা (২৯), মিরপুর ১নং রোডের শিয়ালপাড়ার আবদুল মান্নান (৩৫), তার স্ত্রী ফাহমিদা (৩২), ঢাকার উত্তরার মুহাম্মদ মাসুদ (৩৩), তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা রোমি (৩০) ও ঢাকা দক্ষিণ কোনাসিতের আশিক (২৮)।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার দোলন আচার্য্য জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে রিসোর্টটিতে আগুন লাগার খবর পান তারা। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। পরে সকাল সোয়া ১০টার দিকে আগুন পুরো নিয়ন্ত্রণে আসে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এডিএম আরো বলেন, ‘উদ্ধারকৃত মরদেহগুলোর সিংহভাগ অঙ্গার হওয়ায় কোনজন কে পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্টের পর মরদেহ হস্তান্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
গতকাল সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। কাঠের তৈরি ৩ তলা রিসোর্টটি দ্রুত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের সন্ধান পান উদ্ধারকর্মীরা। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন লাগার পরপরই বাতাস ও রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, সকাল ৭টার দিকে রিসোর্ট থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও এসআরবির সদস্যরা অংশ নেন।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বাড়ছে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি- দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এক দিকে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের কারণে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর রাজস্বের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অন্য দিকে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) সাইবার হামলার ঝুঁকি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের সীমিত রাজস্ব আহরণ, বিপুল উন্নয়ন চাহিদা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এ দুই চ্যালেঞ্জ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক আলোচনা ও মূল্যায়নে ঋণ ব্যবস্থাপনা, সহজ শর্তে অর্থায়ন, আর্থিক খাতের কার্যকর তদারকি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব আলোচনার মূল তাৎপর্য হলো, শুধু নতুন ঋণ সংগ্রহ কিংবা ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার নয়; বরং অর্থের কার্যকর ব্যবহার, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল শনিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ঋণ পরিশোধের চাপ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। ব্রিফিংয়ে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন। এটি সঞ্চালনা করেন আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাক।
জর্জিয়েভা জানান, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর রাজস্ব আয়ের যে অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়, তা গত কয়েক বছরে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের কারণে ঋণের বোঝা বাড়ায় এসব দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
রাজস্বের দুর্বলতায় বাড়ছে উন্নয়ন ব্যয়ের ঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের উন্নয়ন চাহিদা ব্যাপক হলেও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আয়ের তুলনায় সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন বেশি হলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। অন্য দিকে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, চলমান প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সামাজিক খাতে বরাদ্দ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে সরকারি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। এসব খাতে বরাদ্দ কমে গেলে তার প্রভাব শুধু চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ পরিশোধে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক সুদের হার, জ্বালানির দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়াতে পারে। ফলে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি এর সুদের হার, মেয়াদ, পরিশোধের শর্ত এবং অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
এ পরিস্থিতিতে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল বেশি পাওয়া সম্ভব, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও অপচয় কমাতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বণিক বার্তা
‘মেধাবীদের পছন্দের শীর্ষে থাকলেও ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে ব্যাংকের চাকরি’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একসময় ব্যাংক খাতে চাকরি পেতে মেধাবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। সময়ের সঙ্গে তা কমে আসছে। অনিয়ম-দুর্নীতি, চাকরির নিরাপত্তা না থাকা, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যাংকিং পেশা সম্পর্কে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনার মুখে ফেলেছে
একসময় দেশের মেধাবী তরুণদের কাছে ব্যাংকের চাকরি ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় পেশা। বিশেষ করে ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়া। ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্যারিয়ারে উন্নতির সুযোগ—সব মিলিয়ে ব্যাংকের চাকরি ছিল পছন্দের শীর্ষে। কিন্তু গত এক দশকে দেশের অনেকগুলো ব্যাংকের বিপর্যয়ে ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে এ খাতের চাকরি। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বিদেশী ব্যাংকের চাকরিও এখন আর আগের মতো তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।
দেশের ব্যাংকগুলোয় গত বেশ কয়েক বছর ধরে অনিয়ম-দুর্নীতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার, সুশাসনের ঘাটতি ও আর্থিক বিপর্যয়ের খবর ব্যাংকিং পেশা সম্পর্কে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনার মুখে ফেলেছে। অনিয়মে যুক্ত থাকার অভিযোগে দেশের অনেক নামি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা কারাগারে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরির নিরাপত্তার অভাব, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা। ‘সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও হতাশার চাপে’ বেশ কয়েকজন ব্যাংকারের আত্মহত্যার ঘটনাও বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। একসময় যে খাতের চাকরি পেতে মেধাবীদের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, তা সময়ের সঙ্গে কমে আসছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে মেধাবী তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বাড়ছে বিদেশযাত্রার প্রবণতা।
অনেক বেসরকারি ব্যাংক ও সেগুলোর কর্মকর্তাদের অবস্থা নাজুক। লুটপাটের শিকার হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের দিন কাটছে হতাশায়। অনেক কর্মী এরই মধ্যে চাকরি ছেড়েছেন। পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট-বঞ্চিত এ ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে কয়েক ভাগে বেতন-ভাতা তুলতেও বাধ্য হচ্ছেন। একই ধরনের পরিস্থিতি চলছে দেশের বেসরকারি খাতের আরো কয়েকটি ব্যাংকে।
অনিয়ম-দুর্নীতির চাপে কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে ভেঙে পড়ে চতুর্থ প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেয়া বেসরকারি এ ব্যাংক আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দেউলিয়াত্বের মুখে পড়া এ ব্যাংকের কর্মীরা পাঁচ-সাত বছর ধরে ঠিকমতো বেতন-ভাতা তুলতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
চাকরির নিশ্চয়তা থাকলেও ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, ভাবমূর্তি সংকটে মানসিকভাবে হতাশায় দিন পার করছেন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি লুটপাটের শিকার জনতা ও বেসিক ব্যাংকে। এ দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশ ছুঁয়েছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত সবক’টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের গড় হার এখন ৪৭ শতাংশের বেশি। উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি আটটি ব্যাংকই এখন লোকসানি। বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতির চাপেও ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে এ ব্যাংকগুলো।
দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও নিরাপদ মনে করা হতো বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসিতে চাকরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ দুটি ব্যাংকের অনেক কর্মীর চাকরিও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধের ঘোষণা দেয় এইচএসবিসি। এরপর অনেক কর্মী চাকরিচ্যুত হন। চলতি বছরের ৪ জুলাই রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির সংক্ষুব্ধ কর্মীরা বলেন, রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একযোগে এইচএসবিসির ২৫৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে ব্যাংকটিতে কর্মরত ছিলেন।
এইচএসবিসির পথ অনুসরণ করে সম্প্রতি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রি করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এ ঘোষণার ফলে ব্যাংকটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মীর চাকরি ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতা ব্যাংককে এ কর্মীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে—এমন শর্ত দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংকটি। একসঙ্গে উচ্চ বেতনের এত কর্মী অধিগ্রহণ ও বেতন কাঠামোর পার্থক্য নিয়ে ক্রেতাদের আপত্তি থাকায় আলোচনা এগোতে বিলম্ব হচ্ছে। আর বিষয়টি নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘লাইসেন্সহীন ৫ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেক। এখানে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য গড়ে উঠেছে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টসহ অর্ধশতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ। কাঠ, বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব রিসোর্ট পরিবেশবান্ধব হলেও এগুলোর নেই কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। নেই ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এমনকি রিসোর্ট নির্মাণে নেওয়া হয়নি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতি। শুধু পাটুয়ারটেকের রিসোর্ট ও কটেজ নয়, প্রশাসনিক তদারকির অভাবে এভাবে অনুমোদনহীনভাবেই চলছে জেলার প্রায় ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেল মোটেল মালিক সমিতির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ছোট বড় মিলিয়ে কক্সবাজার জেলা শহর, রামুর পেচারদ্বীপ ও ইনানীসহ এর আশপাশে প্রায় ৬ শতাধিক হোটেল মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ রয়েছে। এর অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় সব হোটেলেরই সব ধরনের অনুমোদন রয়েছে। তবে কক্সবাজারের বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। এরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। তাই এদের আমরা সমিতির অন্তর্ভুক্ত করিনি। প্রশাসনের উচিত তাদের একটি নিয়মে এনে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া।
এই বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার কক্সবাজার ইন্সúেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছ থেকে চলতি বছরে মাত্র ৫০টি হোটেল লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। কিন্তু এর আগে প্রায় ২০০ হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ জন্য আমরা অধিকাংশ হোটেলকেই নোটিস দিয়েছি। ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার সময় ফায়ার লাইসেন্সও তদারকি করা হলে তারা তা সংগ্রহ করবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপ-পরিচালক (ফায়ার) সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ বলেন, কক্সবাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট রয়েছে। এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এই যে দুর্ঘটনার আগে এই রিসোর্টকে আমরা দুইবার নোটিস দিয়েছি। কিন্তু তারা সতর্ক হয়নি। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেয়নি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সচেতন হতে হবে। নতুবা এমন দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।
শুধু ফায়ার লাইসেন্স নয় অধিকাংশ হোটেল মোটেল রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাও নেই। এরা পরিবেশ ছাড়পত্র ও নেয়নি। এ বিষয়ে পরিববেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, জেলার সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। ছাড়পত্র না থাকায় গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে ইসি এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে। সাধারণত ২০ কক্ষের নিচের আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র লাগে না। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকা নিচের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে অনুমোদনের দরকার নেই। আর এই সুযোগটিকেই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন কিছু ব্যবসায়ী।
এদিকে জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, কক্সবাজারের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন এসেছে। এর মধ্যে ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠানের সব কাগজপত্র ঠিক থাকায় তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকিদের প্রয়োজনীয় কাগজ জমাদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘অবকাশে পুড়ল ১০ প্রাণ’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের গা ঘেঁষে পাটুয়ারটেক এলাকা। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে নীল জলরাশির উত্তাল সমুদ্র। প্রকৃতির এ অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে পর্যটকদের অবকাশের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল বাঁশ আর কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন তিন তলা স্থাপনা ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’। কিন্তু গতকাল ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পরিণত হলো ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে। রান্নাঘর থেকে আসা বিকট শব্দের পর মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুনের লেলিহান শিখা। চোখের পলকেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘুরতে আসা ১০ জন পর্যটক। আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরও ৯ জন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এখনো দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয়দের কয়েক ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর এখন সেখানে পড়ে আছে কেবলই কয়লা আর ছাইয়ের স্তূপ। স্বজন হারানো মানুষের গগনবিদারী আহাজারিতে পাটুয়াটেক এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় বিভীষিকাময় দৃশ্য। দৃষ্টিনন্দন সেই তিন তলা কাঠের রিসোর্টের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে আছে পোড়া কাঠ, বাঁশ আর টিনের চালা। বাতাসে ভাসছে পোড়া গন্ধ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী সরিয়ে সম্ভাব্য আলামত এবং আর কোনো লাশ আছে কি না খুঁজছিলেন। উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে স্বজনদের কান্না। পুলিশ টুপটুপ রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। ১৮ কিলোমিটার দূরত্বের ফায়ার স্টেশন থেকে ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নেভাতে সক্ষম হন ফায়ার কর্মীরা। প্রথমে ছয়জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তিন তলার দুটি শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয় আরও চারজনের লাশ। তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
কী ঘটেছিল সেই ভয়াল সকালে: ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সেই মুহূর্তের চিত্র। রিসোর্টটিতে ৯টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয় কক্ষে ১৬ জন পর্যটক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। গতকাল সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টের নিচতলায় রান্নাঘরে হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়দের ধারণা, এটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা জেনারেটরের শর্টসার্কিট হতে পারে। শব্দ হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন কাঠের দেয়ালে ধরে যায়। পুরো রিসোর্টটি বাঁশ, কাঠ ও ছন দিয়ে তৈরি এবং সমুদ্রের দিক থেকে প্রবল বাতাস বইছিল, তাই আগুন তিন তলায় ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। ঘুমন্ত পর্যটকরা প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন, কিন্তু অনেকেই বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। গগনবিদারী আর্তনাদ শুনে স্থানীয়রা ছুটে এলেও তাঁরা কোনো সহযোগিতা করতে পারেননি। আগুনের লেলিহান শিখার উত্তাপে ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেননি কেউ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিভীষিকাময় বর্ণনা: পাটুয়াটেকের বাসিন্দা কবির আহমদ ও আবদুল জব্বার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে ওঠেন। তাঁরা বলেন, ‘সকালে বিকট শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে আসি। দেখি দাউদাউ করে জ্বলছে পুরো রিসোর্ট। ভিতরে তখনো মানুষ আটকে পড়া। তাঁদের বাঁচার আকুতি আর চিৎকারে আমাদেরও কাঁদার উপক্রম। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে কাছেও যাওয়া যাচ্ছিল না। চোখের সামনে মানুষগুলো পুড়ে মারা গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করা হয়। কিন্তু উখিয়া বা কক্সবাজার শহর থেকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে কাঠ আর বাঁশের স্থাপনাটি পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে ধসে পড়ে।’
যাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই: একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু। ছুটি কাটাতে এসে লাশ হয়ে ফিরবেন তা হয়তো কল্পনাও করেননি এই পর্যটকরা। উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে ১০ জনের দগ্ধ ও বিকৃত লাশ উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা আশিকুলের পরিবারেরই ছয় সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন মৃত্যুর মিছিলে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তাঁরা হলেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), ঢাকার খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছরের শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। নিহত ব্যক্তিদের শরীর এমনভাবে পুড়ে গেছে যে স্বজনদের পক্ষে তাঁদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠে। প্রশাসন জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লাশ হস্তান্তর করা হবে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন মো. নাফিস তেহামী ও লায়লা জাহান নাবিলা। নাফিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চায়নিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার প্রোগ্রামের আর নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
হাসপাতালে দগ্ধদের আর্তনাদ: অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ দগ্ধ হয়েছেন ৯ জন। তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন দগ্ধ ব্যক্তিরা। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘আহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের শরীরের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালিতে ধোঁয়া ঢোকায় শ্বাসকষ্টেও ভুগছেন অনেকে।’ আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মান্নান (৩২), ফাহমিদা (৩২), মাসুদ (৩০) ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা (৩০), ডা. শিহাব উদ্দিন সাদি (৩১), ডা. নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), আশিক (২৮), আইরিন ও ইমা।
ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও চলছিল রিসোর্ট: সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও ক্ষোভের বিষয়টি জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তিনি জানান, তিন মাস আগে জুনে এ রিসোর্টটি পরিদর্শন করেছিল ফায়ার সার্ভিস। বাঁশ ও কাঠের তৈরি হওয়ায় এবং কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় এটিকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ সেই নোটিসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পরপরই রিসোর্টের মালিকসহ সব স্টাফ পালিয়ে গেছেন। তাঁদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ চরম অবহেলায়ই ১০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
