সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রতারণা ও অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি দমনে দেশের আটটি বিভাগীয় সদরে দ্রুত ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে কেন্দ্র থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পুলিশের ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানো হবে। অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ লাইন্সের দামপাড়ায় সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত ভবন ও পরীক্ষাগার পুলিশের অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে। নতুন পরীক্ষাগারটি অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। তবে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ৮টা বিভাগীয় সদর দপ্তরে আমরা খুব দ্রুত এই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করব। আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছি। কোরীয় সরকারের সহযোগিতা আজকেও আমরা চেয়েছি আমাদের এই ফরেনসিক ল্যাবগুলো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।’
সাইবার অপরাধের বিস্তার তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে অপরাধের ধরন পাল্টেছে। সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে কারসাজির মতো অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের বিকল্প নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সাইবার ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১ অক্টোবর থেকে ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাইবার পুলিশ ইউনিটের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। অপরাধের ধরন ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশকে আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে প্রস্তুত করা হবে।
সিআইডির বিদ্যমান পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, সিআইডি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রাসায়নিক পরীক্ষাগার পরিচালনা করে আসছে। সেখানে বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা ও প্রতিবেদন তৈরির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সঙ্গে পরীক্ষাগারের সক্ষমতার সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের বিচারপ্রাপ্তি দ্রুত করতে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সনদ প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ডিজিটাল তদন্ত ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জাতীয় ও আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ সাইবার পরিসর’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কোরীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা) এ প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে।
২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। একই বছরের ১৫ মে জারি করা হয় প্রশাসনিক আদেশ। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ১০ তলা ভবনের ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি সিআইডি সদর দপ্তরে সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তিনটি দেশীয় ও আটটি বিদেশি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার, পরিচয় জালিয়াতি, ভুয়া ওয়েবসাইট, আর্থিক প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল এবং ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অননুমোদিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ মোকাবিলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে এসব মাধ্যম ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়ছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে অপরাধ সংঘটন, একাধিক ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর এবং ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলা বা পরিবর্তনের কারণে তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে অপরাধী শনাক্তকরণ, অর্থের গতিপথ অনুসরণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামে সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের কার্যক্রম এবং পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ এসব অপরাধের তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য নাশকতা, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সব বিষয়ে দায়িত্ব আছে, চ্যালেঞ্জ নাই।’
পুলিশের অভিযানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ এবং আসামি গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমন করতে গিয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হয়, এটি নতুন ঘটনা নয়। অপরাধীদের দমনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে কেউ যদি আসামিকে সহায়তা দিয়ে থাকে, সেই ক্ষেত্রেও আমরা যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেব, যদি আপনারা তথ্য দেন। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। এ ছাড়া পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন এবং কোইকার বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক জি-হুন কিম উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন।
