আজকাল ওয়েবডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি মানবজাতির জন্য চতুর্থ বড় অপমান নিয়ে আসছে? এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ। তিনি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সেই ধারণার উল্লেখ করেন, যেখানে মানব আত্মমর্যাদার ওপর তিনটি বড় আঘাতের কথা বলা হয়েছে। কোপার্নিকাস দেখিয়েছিলেন যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, ডারউইন মানুষের এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন যে মানুষ প্রাণীজগৎ থেকে আলাদা। আর ফ্রয়েড যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মানুষ নিজের মনের ওপর পুরোপুরি যুক্তিবাদী নিয়ন্ত্রক নয় বরং আমাদের যুক্তিবাদী সত্তার গভীরে রয়েছে এক বিশাল অযৌক্তিক জগত। এখন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ প্রশ্ন তুলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের সেই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে যে- বুদ্ধি ও যুক্তিই মানুষকে অনন্য করে তুলেছে?
'ক্যান কোড বি কনশাস? রিথিংকিং দ্য মাইন্ড ইন দ্য এজ অফ এআই' শীর্ষক এক অধিবেশনে স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ বলেন, "মানবজাতি প্রথম বড় অপমানটির মুখোমুখি হয়েছিল কোপার্নিকাসের মাধ্যমে, যিনি দেখিয়েছিলেন যে আমরা মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নই, বরং একটি ক্ষুদ্র গ্রহে বাস করি। এরপর আসে দ্বিতীয় বড় অপমান- ডারউইনের তত্ত্ব। আমরা ভেবেছিলাম, ঠিক আছে, আমরা মহাবিশ্বের কেন্দ্র না হতে পারি, কিন্তু অন্তত আমরা তো ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে তৈরি! কিন্তু ডারউইন এসে দেখালেন যে, না, তোমরা আসলে শিম্পাঞ্জির প্রতিমূর্তিতে তৈরি, তোমরা বানরজাতীয় প্রাণী থেকেই বিবর্তিত হয়েছ।"
তিনি আরও বলেন, "এরপর ফ্রয়েড বললেন, আমি মানবজাতির জন্য তৃতীয় বড় অপমানটি নিয়ে এসেছি। আমরা ভেবেছিলাম, ঠিক আছে, আমরা প্রাণী হতে পারি, কিন্তু অন্তত আমরা যুক্তিবাদী প্রাণী। আর ফ্রয়েড বললেন, আমাদের তথাকথিত যৌক্তিকতা হল হিমশৈলের চূড়ার মতো- যার নীচে রয়েছে অযৌক্তিকতার এক বিশাল গভীর জগত, যাকে বলা হয় অবচেতন মন।"
স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ প্রশ্ন রাখেন, "এখন, এই প্রেক্ষাপটেই কি আমাদের আজকের দিনে প্রশ্ন তোলার সময় আসেনি যে ক্লড, চ্যাটজিপিটি এবং ওপেনএআই-এর মতো প্রযুক্তিগুলো কি মানবজাতির জন্য চতুর্থ বড় অপমান বয়ে আনছে?" এই সন্ন্যাসী ছিলেন ১৫টিরও বেশি ধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেই পণ্ডিতদের একজন, যাদেরকে ‘ক্লড’ এআই মডেলের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ আমন্ত্রণ জানিয়েছিল- এআই-এর নৈতিকতা, নীতিবোধ ও চেতনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য।
স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ বলেছেন যে, নিজ নিজ ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন, কারণ তাঁরা যে কাজ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তা আরও দ্রুত ও ভালভাবে সম্পন্ন করতে পারছে।
স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ আরও বলেন, "আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের নিজেদের আবারও প্রশ্ন করতে হবে- ঠিক কী আমাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে? কী আমাদের বিশেষ ও অনন্য করে তোলে? আমাদের কোথায় নিজেদের নিয়োজিত করা উচিত? আর এর উত্তর খুঁজতে আমাদের তাকাতে হবে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের দিকে।"
সুতরাং, প্রশ্নটি কেবল এটিই নয় যে যন্ত্র চিন্তা করতে পারে কি না, বরং যন্ত্রের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা মানব বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়, সেটিই আসল প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে যুক্তি কেবল মানুষেরই বৈশিষ্ট্য, তবে তা মানবজাতিকে মন, চেতনা এবং বিশ্বে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়াকে নতুন করে ভেবে দেখতে বাধ্য করতে পারে।
