যে কণা সবকিছু ভেদ করে চলে যায়, তাকে ধরা তো প্রায় অসম্ভব! এহেন মায়াবী কণাকে শনাক্ত করে মহাবিশ্বকে দেখার নতুন এক জানালা খুলে দিয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। তাঁর সেই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিতেই মিলল ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার। লিখছেন শমীক হক মণ্ডল।
প্রতি মুহূর্তে, মহাবিশ্ব থেকে অসংখ্য অদৃশ্য কণা আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে। আমরা এর কিছুই টের পাই না। এই রহস্যময় কণার নাম ‘নিউট্রিনো’। এদের তড়িৎ আধান নেই, ভর প্রায় শূন্যের কোঠায়, আর অন্য পদার্থের সঙ্গে এদের ধাক্কা লাগার প্রবণতা এতটাই কম যে, একটি সাধারণ নিউট্রিনো কণা এক আলোকবর্ষ পুরু সিসার পাতের মধ্য দিয়েও অনায়াসে চলে যেতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানীরা তাই এদের নাম দিয়েছেন ‘ভূতুড়ে কণা’ (ghost particle)।
গত কয়েক দশক ধরে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা অনুমান করছিলেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে তীব্র ও সহিংস ঘটনাগুলো থেকেই এদের জন্ম। সুদূর গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থিত অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর থেকে নির্গত রশ্মি, নক্ষত্রের বিস্ফোরণ (সুপারনোভা) কিংবা প্রলয়ঙ্করী মহাজাগতিক ত্বরণ ক্ষেত্রগুলোতে সৃষ্টি হয় এই উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো। কিন্তু সমস্যা একটাই– যে কণা সবকিছু ভেদ করে চলে যায়, তাকে ধরা তো প্রায় অসম্ভব! এহেন মায়াবী কণাকে শনাক্ত করে মহাবিশ্বকে দেখার নতুন এক জানালা খুলে দিয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। তঁার সেই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিতেই মিলল ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার।
অধ্যাপক হ্যালজেনের যুগান্তকারী দূরদৃষ্টির বলেই দক্ষিণ মেরুর আন্টার্কটিকায় প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফের স্তম্ভ রূপান্তরিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত ও শক্তিশালী টেলিস্কোপে। তিনি প্রমাণ করেছেন, মহাকাশের গভীরতম প্রান্ত থেকে ভেসে আসা নিউট্রিনো বার্তা আর আমাদের নাগালের বাইরে নেই।
১৯৮৮ সালে ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হ্যালজেন সর্বপ্রথম দক্ষিণ মেরুর হাজার বছরের পুরনো বরফকে নিউট্রিনোর ফঁাদ হিসাবে ব্যবহার করার ধারণা দেন।
প্রশ্ন হচ্ছে– আইসকিউব কীভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিল? এর উত্তর খোঁজার আগে দেখতে হবে এত দিন কীভাবে আমরা মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতাম। সেই গ্যালিলিওর সময় যখন থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল হাতিয়ার ছিল আলো। কালের বিবর্তনে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে কিংবা গামা রশ্নি। কিন্তু আলো দিয়ে মহাবিশ্ব দেখার একটা বড় সমস্যা রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব পুরোপুরি পরিষ্কার নয়; চারপাশ ধূলিকণায় ভরা। দূরদূরান্তের মহাজাগতিক কেন্দ্রে উৎপন্ন উচ্চশক্তির গামা রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছনোর আগেই মহাশূন্যে ভেসে থাকা অন্য নক্ষত্রের আলো বা ধূলিকণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে হারিয়ে যায়। ফলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিস্ফোরক ঘটনাগুলো অনেক সময় বিজ্ঞানীদের অগোচরে রয়ে যায়। তাহলে উপায়?
এরপর বিজ্ঞানীরা নজর দেন মহাজাগতিক রশ্মি বা কসমিক রে-র দিকে, যা মূলত আলোর কাছাকাছি গতিতে ধেয়ে আসা ধনাত্মক আধানযুক্ত পারমাণবিক নিউক্লিয়াস। কিন্তু যেহেতু মহাজাগতিক রশ্মির তড়িৎ আধান রয়েছে, তাই মহাশূন্যের গ্যালাকটিক চুম্বকীয় ক্ষেত্র তাদের গতিপথকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। সেজন্য পৃথিবীতে পৌঁছনোর পর তাদের গতিপথ দেখে আসল উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এসব সমস্যার জুতসই সমাধান হল নিউট্রিনো, কারণ এরা আধানহীন, তাই মহাজাগতিক চুম্বকীয় ক্ষেত্রে বেঁকে যায় না। আবার, দুর্বল নিউক্লীয় বল ছাড়া এরা অন্য কোনও কিছুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে না, ফলে মহাজাগতিক ধূলিকণা, মেঘের আস্তরণ বা গ্যাস, কোনও কিছুই এদের আটকাতে পারে না। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেও নিউট্রিনো একদম সোজা সরলরেখায় ধেয়ে আসে। কিন্তু যে কণা আস্ত পৃথিবী ভেদ করে চলে যায়, তাকে বিজ্ঞানীরা বঁাধবেন কীভাবে?
১৯৮৮ সালে ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হ্যালজেন সর্বপ্রথম দক্ষিণ মেরুর হাজার বছরের পুরনো বরফকে নিউট্রিনোর ফঁাদ হিসাবে ব্যবহার করার ধারণা দেন। তঁার যুক্তিটি ছিল অত্যন্ত গাণিতিক ও আকর্ষণীয়– মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং এদের ধাক্কা লাগার সম্ভাবনাও নগণ্য। তাই এদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শনাক্ত করতে হলে অন্তত এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের একটি স্বচ্ছ মাধ্যমের প্রয়োজন।
ঠিক এই জায়গাটিতেই দেখা যায় আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার এক চমৎকার রূপ। আমরা জানি, শূন্যস্থানে আলোর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি– প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,০০,০০০ কিলোমিটার।
কাচ বা স্টিল দিয়ে এত বড় এক ট্যাঙ্ক তৈরি করার খরচ অনেক, এমনকী প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃতি দক্ষিণ মেরুতে আগেই সেই ট্যাঙ্ক বানিয়ে রেখেছিল, অান্টার্কটিকার উপরিভাগ থেকে প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ কিলোমিটার গভীরে রয়েছে শত সহস্র বছরের প্রাচীন বরফ স্তর। মাইলের পর মাইল বরফের প্রচণ্ড চাপে সেখান থেকে বাতাসের বুদ্বুদ পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়ে বরফ পরিণত হয়েছে স্বচ্ছ আয়নায়। ল্যাবরেটরিতে তৈরি যে কোনও কাচের চেয়েও এই বরফ বহু গুণ পরিষ্কার, এর মধ্য দিয়ে আলো অনায়াসে অবিকৃতভাবে শত শত মিটার পথ পাড়ি দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা তীব্র উচ্চচাপের জলের স্রোত ব্যবহার করে বরফের গভীরে আড়াই কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত গর্ত খোঁড়েন। সেই সরু ও বাষ্পে ভরা গর্তগুলির ভিতর প্রবেশ করানো হয় সুদীর্ঘ তারের শৃঙ্খল, যার সঙ্গে লাগানো ছিল গোলাকৃতির ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল নামক অতি-সংবেদনশীল আলোক সেন্সর। ২০১১ সালে যখন আইসকিউবের নির্মাণকাজ শেষ হয়, ততক্ষণে দক্ষিণ মেরুর এক ঘনকিলোমিটার বরফের ভিতর নিউট্রিনোর জন্য ওত পেতে রয়েছে ৫,১৬০টি আলোক সেন্সর। বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় একটা আস্ত হিমবাহ নিজেই রূপ নিল সুবিশাল এক টেলিস্কোপে!
এই আইসকিউব কিন্তু সরাসরি নিউট্রিনোকে ধরে না; বরং নিউট্রিনো কখন বরফের পরমাণুর সঙ্গে হঠাৎ ধাক্কা খাবে, সেই বিরল মুহূর্তের প্রতীক্ষায় থাকে এই অবজারভেটরি। প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো কোনও চিহ্ন না রেখে আইসকিউব পার হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করেই হয়তো কোনও একটি উচ্চশক্তির নিউট্রিনো বরফের জলের অণুর (অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন) নিউক্লিয়াসে সরাসরি আঘাত হানে। সেই তীব্র সংঘাতের ফলে নিউক্লিয়াসটি ভেঙে যায় এবং তৈরি হয় ‘মিউঅন’ নামক উচ্চগতির একটি চার্জযুক্ত গৌণ কণা। এই কণাটি প্রায় আলোর সমান গতিতে বরফের বুক চিরে ছুটতে শুরু করে।
ঠিক এই জায়গাটিতেই দেখা যায় আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার এক চমৎকার রূপ। আমরা জানি, শূন্যস্থানে আলোর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি– প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,০০,০০০ কিলোমিটার। কিন্তু বরফের মতো ঘন মাধ্যমে আলোর গতি কমে দঁাড়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,২৫,০০০ কিলোমিটারে। এর ফলে, নিউট্রিনো থেকে জন্ম নেওয়া মিউঅন কণাটি ওই বরফের মাধ্যমের ভিতর আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করে (যদিও তা শূন্যস্থানে আলোর গতির চেয়ে কম)!
২০১৩ সালে আইসকিউব গবেষকেরা ২৮টি অতি উচ্চশক্তির ঘটনা বিশ্লেষণ করে শক্তিশালী প্রমাণ পান যে এসব নিউট্রিনোর একটি অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তৈরি নয়, এসেছে মহাকাশের বহু দূরের উৎস থেকে।
যখনই কোনও চার্জযুক্ত কণা স্থানীয় মাধ্যমে আলোর গতিকে ছাপিয়ে যায়, তখনই সেখানে
জন্ম নেয় এক অদৃশ্য আলোকতরঙ্গ, যার পারিভাষিক নাম ‘শেরেনকভ বিকিরণ’। সোজা কথায়, আকাশে বিমান শব্দের গতিসীমা পার করলে যেমন ‘সনিক বুম’ বা তীব্র শব্দের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনই আলো মাধ্যমটির ভিতর আলোর গতি অতিক্রম করলে তৈরি হয় নীলাভ আলোর এক অপূর্ব মহাজাগতিক তরঙ্গ। বরফে লুকনো আইসকিউবের অপটিক্যাল সেন্সরগুলো ন্যানোসেকেন্ডের সূক্ষ্মতায় এই নীলাভ আলোর ঝলকানি ও তার তীব্রতা রেকর্ড করে। এরপর সুপারকম্পিউটারের অ্যালগরিদম সেই আলোর গতিপথ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করে কোন দিক থেকে মূল নিউট্রিনো কণাটি পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল।
২০১৩ সালে আইসকিউব গবেষকেরা ২৮টি অতি উচ্চশক্তির ঘটনা বিশ্লেষণ করে শক্তিশালী প্রমাণ পান যে এসব নিউট্রিনোর একটি অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তৈরি নয়, এসেছে মহাকাশের বহু দূরের উৎস থেকে। তবে সবচেয়ে বৈপ্লবিক মুহূর্তটি আসে ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর; সেদিন আইসকিউবে অত্যন্ত উচ্চশক্তির একটি নিউট্রিনো ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম বিশ্বজুড়ে সমস্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দিরে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। সেই সংকেত অনুযায়ী, আকাশের নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে তৎক্ষণাৎ টেলিস্কোপ তাক করে পৃথিবীর বিভিন্ন মানমন্দির। রেডিও তরঙ্গ, অপটিক্যাল, এক্স-রে এবং গামা-রে টেলিস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করতেই ধরা পড়ে ‘TXS 0506+056’ নামের একটি দূরবর্তী ‘ব্ল্যাজার’। এটি এমন এক ছায়াপথ, যার কেন্দ্রে থাকা একটি বিশালাকার কৃষ্ণগহ্বর থেকে বিপুল শক্তিকণার জেনারেটর সোজা পৃথিবীর দিকে মুখ করে তীব্র আলোকছটা নির্গত করছে। ইতিহাসে এই প্রথমবার মানুষ কোনও নির্দিষ্ট মহাজাগতিক উৎসের সাথে উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর যোগসূত্র খুঁজে পেল।
আলো আমাদের দেখিয়েছিল ব্ল্যাজারের বাহ্যিক রূপ, আর নিউট্রিনো প্রকাশ করে দিল সেই ব্ল্যাক হোলের ভিতরকার কণা ত্বরণের গতিবিদ্যা। জ্যোতির্বিদ্যার জগতে তৈরি হল এক নতুন
শাখা-মাল্টিমেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি, যেখানে একাধিক মাধ্যম বা বার্তাবহক একসঙ্গে কঁাধে খঁাধ মিলিয়ে মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানে নেমে পড়ে।
পৃথিবীর তলদেশে বরফের গভীরে ফুটে ওঠা সেই মৃদু নীল আলোর সংকেত এখন আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে দূর-দূরান্তের কৃষ্ণগহ্বর আর মহাজাগতিক বিস্ফোরণের তাজা খবর।
২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার মূলত মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দূরদর্শী কল্পনার জয়গান গায়। ফ্রান্সিস হ্যালজেন এবং আইসকিউবের আন্তর্জাতিক গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃতির সবচেয়ে লাজুক ও ভূতুড়ে কণাগুলোও হতে পারে মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তাবাহক।
এখন থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে গ্যালিলিওর তৈরি ছোট্ট টেলিস্কোপ যেমন সৌরজগতের গ্রহদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল, তেমনই দক্ষিণ মেরুর বরফে জমে থাকা আইস কিউবও মহাবিশ্বকে জানার এক নতুন চোখ খুলে দিল। পৃথিবীর তলদেশে বরফের গভীরে ফুটে ওঠা সেই মৃদু নীল আলোর সংকেত এখন আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে দূর-দূরান্তের কৃষ্ণগহ্বর আর মহাজাগতিক বিস্ফোরণের তাজা খবর। মহাবিশ্ব তো সবসময়ই কিছু না কিছু জানান দেয়, আইসকিউব নিউট্রিনো মানমন্দির শেখাল কীভাবে সেই গান শুনতে হয়।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
