দেশের টেলিযোগাযোগ খেকে পুরোনো ও ধীরগতির প্রযুক্তি বিদায় দিয়ে আধুনিক ও দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক চালুর অংশ হিসেবে ২০২৯ সালের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
এই পরিকল্পনাকে বিটিআরসি ‘টু-জি সানসেট’ (2G Sunset) নামে অভিহিত করেছে। লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে টু-জি মোবাইল হ্যান্ডসেট বা বাটন মোবাইল ফোনের আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণও ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বিটিআরসির কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী গত ১৫ অক্টোবর বিকেলে টেলিফোনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, ২০২৪ সালে প্রকাশিত স্পেকট্রাম রোডম্যাপে ৫ বছরের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক এবং এই নেটওয়ার্ক নির্ভর হ্যান্ডসেট বাজারজাতকরণ বন্ধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও মোবাইল অপারেটরদের মতামতের ভিত্তিতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এই রোডম্যাপে কোন সময়ে আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করা হবে, তার সময়সীমা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমোদন চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় প্রস্তাব অনুমোদন করলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। এটা আমরা করবও। তবে এক্ষেত্রে উৎপাদক ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে না পড়েন, সেজন্য কৌশল নেওয়া হচ্ছে। হিসাব করে দেখা গেছে, একটি টু-জি মোবাইল হ্যান্ডসেটের লাইফটাইম দুই থেকে আড়াই বছর। এই সময়টি এমনভাবে আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধে প্রয়োগ করা হবে, যাতে কেউ ক্ষতির মুখে না পড়েন। অন্যদিকে ব্যবহারকারীরা যাতে সাশ্রয়ী দামে নতুন স্মার্টফোন পান, সেজন্যও আমরা কাজ করছি। কারণ ৬ থেকে ৭ কোটি মানুষ এখনও টু-জি মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করছেন এবং তাদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের।’
এই লক্ষ্যে কর কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এবং ইএমআই ব্যবস্থা চালু ও ইএমআইয়ে সুদের হার কম রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
ধাপে ধাপে বন্ধের সময়সীমা
বিটিআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টু-জি হ্যান্ডসেট বন্ধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ওডিএম অনুমোদন: চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওডিএম (অরিজিনাল ডিজাইন ম্যানুফ্যাকচারার) দের অনুমোদন দেওয়া হবে। এরপর এ ধরনের উৎপাদকদের আর টু-জি মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হবে না। এটি এমন এক ধরনের ব্যবসায়িক মডেল যেখানে একটি কোম্পানি নিজেই একটি মোবাইল ফোনের ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উৎপাদন সম্পূর্ণ করে, কিন্তু পরবর্তীতে অন্য কোনো নামী ব্র্যান্ডের লোগো বসিয়ে বাজারে বিক্রি করে।
পিসিবিএ অনুমোদন: পিসিবিএ (প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড অ্যাসেম্বলি) অনুমোদন দেওয়ার শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। একটি মোবাইল বাজারজাত করার আগে তার মাদারবোর্ডটি সব দিক থেকে নিরাপদ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং সঠিকভাবে কাজ করছে কি না—তা সরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে পাস করানোই হলো পিসিবিএ অনুমোদন।
উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ: আগামী বছরের ৩০ জুনের পরে উৎপাদিত টু-জি মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট বাজারজাতকরণের আর অনুমোদন দেওয়া হবে না। টু-জি নির্ভর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও বেতার যন্ত্র আমদানির শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে আমদানি করা এ ধরনের যন্ত্রপাতি ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ফোর-জি প্রযুক্তিতে স্থানান্তর করা যাবে। আর, গ্রাহক পর্যায়ে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ২০২৯ সাল ধরে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার কার্যক্রম নিয়ে এগোনো হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনা সর্বোচ্চ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পেছাতে পারে।
তিনি বলেন, ‘টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার মূল উদ্দেশ্য হলো পুরোনো, ধীরগতির প্রযুক্তি বিদায় দিয়ে আধুনিক ও দ্রুতগতির নেটওয়ার্কের জন্য পথ তৈরি করা। টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে সেই তরঙ্গ নতুন প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হবে।’
তিনি জানান, টু-জি প্রযুক্তির তুলনায় ফোর-জি বা ফাইভ-জি প্রযুক্তি একই পরিমাণ তরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক বেশি ডেটা এবং কল সরবরাহ করতে পারে, যা দিয়ে গ্রাহকদের আরও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব। এতে টেলিকম অপারেটরদের খরচ কমবে এবং ডেটা বা কলরেট কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ টিবিএসকে বলেন, ‘টু-জি নেটওয়ার্ক থেকে বের হয়ে আসার উদ্যোগ ঠিক আছে। তবে যে টাইমলাইন ঠিক করা হয়েছে, সেটি আরও পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ ৬ কোটির বেশি গ্রাহককে এত কম সময়ে নতুন ব্যবস্থায় মাইগ্রেট করানো সহজ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কার্যক্রম অন্যান্য দেশে যেভাবে হয়েছে এবং হচ্ছে, সেভাবে হওয়া উচিত। শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, মোবাইল অপারেটরদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকার টু-জি মোবাইল হ্যান্ডসেটের যোগান বন্ধ করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। কিন্তু সরকারকে এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার টাকার কমে একটি মোবাইল হ্যান্ডসেট পাচ্ছেন ক্রেতারা, যেটি স্মার্টফোন ব্যবস্থায় দেওয়া সম্ভব হবে না।’
